মতামত
মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার উপায়
আনোয়ার ফারুক তালুকদার
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২২ | ০৩:২৫ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২২ | ০৮:৩৪
উন্নত, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত প্রায় সব দেশই চরম মুদ্রাস্টম্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র; জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির সাক্ষী। ইউরোজোন অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির নতুন রেকর্ড হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। খাদ্য-বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। জুলাইয়ে জার্মানির মুদ্রাস্টম্ফীতি পৌঁছেছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে। জার্মানিসহ মূল্যস্ফীতির চাপে ধুঁকছে পুরো ইউরোপ। গত ২৫ বছরে সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মুখে পড়েছে ইউরোজোনভুক্ত ১৯ দেশ।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা গেছে স্পেনে। দেশটিতে ৩৮ বছর পর জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৮ শতাংশ, যা এক মাস আগেও ছিল ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এদিকে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ায় ৪০ বছরে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা গেছে যুক্তরাজ্যে। জুলাইয়ে এর হার ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। আর ১৯৮১ সালের নভেম্বরের পর জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশে।
অর্থনীতি বিশ্নেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে। করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বিশ্ব-অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পাশপাশি বিশ্ববাজারে খাদ্য, জ্বালানিসহ পণ্যসামগ্রীর দাম ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাস ও খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোই এতে বেশি বেকায়দায় পড়েছে। তাদের ওপর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ পড়ছে। এ জন্য ভোক্তাদের বাধ্য হয়ে খরচ কমাতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় দেশে দেশে নীতিনির্ধারকদের ওপরেও মূল্যস্ফীতিনিয়ন্ত্রণের চাপ বাড়ছে। অর্থশাস্ত্রের নিয়মানুযায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতিরোধ করতে ব্যাংকের সুদহার বাড়িয়ে দিতে হয়। বাড়তি সুদে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ঋণ গ্রহণ করা কমিয়ে দেবেন। ফলে বাজারে অর্থপ্রবাহ কমে আসবে। অর্থপ্রবাহ কম মানে, বাজারে কম মানুষ কিনতে যাবে বা কেনার পরিমাণ কমিয়ে দেবে। তাতে পণ্যসামগ্রীর দাম পড়তে বাধ্য। কারণ মানুষের হাতে অর্থ কম থাকায় চাহিদা কমে আসবে। চাহিদা কম মানে মুদ্রাস্টম্ফীতি কমতির দিকে থাকবে। মুদ্রাস্টম্ফীতি কমার ক্ষতিকর প্রভাব বাজারে পড়লে অর্থনীতি ক্ষতিতে পড়তে পারে; তবে আশা করা যায়, সেটা সাময়িক। দীর্ঘ মেয়াদে এটা বাজারের জন্য ভালো ফল বয়ে আনতে পারে। মুদ্রাস্টম্ফীতি কমতে থাকলে ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে আবারও তারল্য প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আনয়ন সম্ভব। অর্থের পরিমাণতত্ত্ব অনুযায়ী, অর্থের ছড়াছড়ি কমে গেলে পণ্যসামগ্রীর দাম কমতে বাধ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ মাত্র গত কয়েক মাসে নীতি সুদ হার তিনবার বাড়িয়েছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া গত মে মাস থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিনবার নীতি সুদের হার বাড়িয়েছে। যেহেতু দাম বেড়েই চলছে, সেহেতু নীতি সুদের হার ক্রমাগত বাড়াতে হবে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও যাতে ঋণের সুদহার বাড়ায়, সেদিকে তদারকি রাখতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক সময় খোলাবাজারে সরকারি ঋণপত্র বিক্রয় করে বাজার থেকে অর্থ উঠিয়ে পরিমাণ কমাতে চেষ্টা করে। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণদান ক্ষমতা কমে যায়।
এভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খোলাবাজারে ঋণপত্র বিক্রয় করে মুদ্রাস্টম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক সময় বাণিজ্যিক ব্যাংকের রিজার্ভের হার পরিবর্তন, নৈতিক চাপ প্রয়োগ, প্রত্যক্ষ ঋণ নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতির সাহায্যে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রাস্টম্ফীতি দূর করার চেষ্টা করে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় প্রতিটি দেশই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে, যার বাস্তব প্রমাণ ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। মুদ্রাস্টম্ফীতি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, মুদ্রাস্টম্ফীতির সঙ্গে বেকারত্ব দেখা দিলে স্টাগফ্ল্যাশন অবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে, যা অর্থনীতির জন্য আরও বিপজ্জনক হতে পারে। বেকারত্ব বাড়লে সমাজে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। তাই সবকিছু সামলে নিতে এখনই যুগোপযোগী এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।