গণপ্রহারে হত্যা এবং গৃহকর্মী নির্যাতন
আইনের শাসনে ঔদাসীন্যের ফল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে এক দল মানুষের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা এবং বর্বর মানসিকতা কতটা জাঁকিয়া বসিয়াছে, সাম্প্রতিক দুইটি ঘটনা পুনরায় তাহা জনসমক্ষে তুলিয়া ধরিয়াছে। প্রথম ঘটনাটি, বুধবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে ঘটিয়াছে। যেইখানে চোর সন্দেহে ফয়সাল নামে এক যুবকের দুই হাত বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বাঁধিয়া, পৃষ্ঠে ইষ্টকের উপর ইষ্টক দিয়া উপর্যুপরি প্রহারে তাহাকে হত্যা করা হইয়াছে। গত মঙ্গলবার সকালে উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকার মিয়াজির পাড়ায় মাওলানা কেফায়েত উল্লাহর বাড়িতে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় ঘটনাটি, সোমবার প্রকাশিত সমকালেরই এক প্রতিবেদন অনুসারে ঢাকায় ঘটিয়াছে। যথায় গৃহকর্মী শিশু তানিয়াকে খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়া, বাথরুমে বন্দি রাখিয়া দেড় বৎসারাধিক সময় ধরিয়া অমানুষিক নির্যাতন চালানো হইয়াছে। যাহার ফলে তাহার পায়ে পচন ধরিয়াছে; মাথা ও থুতনিতেও সে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত। উভয় ঘটনাই প্রমাণ করে, নিজেদেরকে আমরা যতই সভ্য বলিয়া দাবি করি, সমাজে মানবিক মূল্যবোধের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটিতেছে। একদিকে আইন স্বহস্তে তুলিয়া লইবার উন্মাদনা, অপরদিকে গৃহকোণে দুর্বল শিশুর উপর ক্ষমতার পাশবিক প্রকাশ– কোনোটাই সভ্যতার পরিচায়ক নহে। বরং দুইটি অপরাধই সমাজ ক্রমশ নৈরাজ্যে ডুবিয়া যাইবার চিহ্ন বহন করিতেছে।
চোর সন্দেহে সভ্য সমাজে এক ব্যক্তিকে আইন-আদালতের হস্তে সোপর্দ করাই নিয়ম। কারণ কোনো ব্যক্তি অপরাধী কিনা, তাহা নির্ধারণ করিবার দায়িত্ব আদালতের; কোনো উন্মত্ত জনতা বা কতিপয় যুবকের নহে। অথচ সমাজ আজ এমন এক পর্যায়ে উপনীত, যেইখানে সন্দেহবশত মানুষকে বাঁধিয়া প্রহারে হত্যা করিতে কাহারও বিবেক দংশন করে না। অপরদিকে, ১১ বৎসরের শিশু গৃহকর্মী তানিয়ার উপর গৃহকর্ত্রীর অবর্ণনীয় নির্যাতন দেখাইয়া দেয়, গৃহকর্মীদের প্রতি আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা নির্মম ও সামন্তবাদী। শিশুটিকে নিয়মিত আহার না দিয়া, তাহার কোমল শরীরে পাশবিক নির্যাতন চালাইয়া পাষণ্ড গৃহকর্ত্রী ক্ষান্ত হন নাই। পিতার সহিত তাহার যোগাযোগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করা হইয়াছিল গত দেড় বৎসর। অধিকতর বিস্ময়কর, শিশুটির পিতা জানিতেন না, তাঁহার কন্যা কাহাদের বাড়িতে কাজ করে এবং আদৌ কতটা নিরাপদে রহিয়াছে। দারিদ্র্যের সুযোগ লইয়া গৃহকর্মীদের ক্রীতদাস হিসাবে গণ্য এবং তাহাদের উপর ক্ষমতার দম্ভ প্রদর্শন করিয়া এহেন অন্যায়-অত্যাচার চালানো উক্ত গৃহকর্ত্রীর মানসিক বিকৃতিরও প্রমাণ বহন করে।
সন্দেহ নাই, এই দুই মর্মান্তিক ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধের দলিল নহে। বিশেষত গণপ্রহার ও মব সহিংসতা সাম্প্রতিক দুই বৎসরে ব্যাপক বৃদ্ধি পাইলেও গৃহকর্মী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বিগত বহু দশক ধরিয়াই ঘটমান। উভয় ক্ষেত্রেই এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে বহুবার আমরা মন্তব্যের পাশাপাশি এহেন পাশবিকতা বন্ধে আইন ও সামাজিক জোরালো পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করিয়াছি। তবে ওই সকল কিছুই যে অন্তত রাষ্ট্র ও সমাজের কর্তাব্যক্তিদের নিকট এক প্রকার অরণ্যে রোদনে পরিণত হইয়াছে; আলোচ্য দুই ঘটনায় তাহা স্পষ্ট। ইহাও অস্বীকার করা যাইবে না, দুই ঘটনাতেই ভুক্তভোগীর অবস্থান সমাজের প্রান্তিক স্তরে। অর্থাৎ দুই ঘটনাই রাষ্ট্র ও সমাজের চিরাচরিত দরিদ্র ও দুর্বলের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের নজির তুলিয়া ধরিয়াছে। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সরকারি অঙ্গীকার কার্যকর করিতে হইলে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপকদের এহেন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করিতে হইবে।
তদুপরি এহেন ঘটনায় ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব না হইলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিবে। তাই অবিলম্বে ফয়সাল হত্যায় জড়িত উন্মত্ত ঘাতকদের এবং তানিয়াকে নির্যাতনকারী গৃহকর্ত্রীকে আইনের আওতায় আনিয়া দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করিতে হইবে। এহেন নৃশংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতাও জরুরি।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়