ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডাকসুর আলোকচিত্র বিতর্ক

ইতিহাস বিকৃতির অবিমৃষ্যকারিতা

ইতিহাস বিকৃতির অবিমৃষ্যকারিতা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় যেই প্রকারে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক আলোকচিত্র অপসারণ করিয়া তৎস্থলে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর আলোকচিত্র স্থাপন করা হইয়াছে, যাহা অবিমৃষ্যকারিতা ব্যতীত অন্য কিছু নহে। এমনকি মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর তিনটি আলোকচিত্রের একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের এক অনুষ্ঠানের, যেইখানে তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অপমানস্বরূপ ঘোষণা দিয়াছিলেন– ‘উর্দু এবং কেবল উর্দুই হইবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ প্রশ্ন জাগে, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ডাকসু কি বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার গৌরবজনক অধ্যায়টি মুছিয়া ফেলিতে চাহিতেছে? শুধু উহাই নহে, সংগ্রহশালায় ইসলামী ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা আবদুল মালেকের আলোকচিত্রও রাখা হয়, যেই সংগঠনের নেতাকর্মী মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যার হোতা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়াছিল। বস্তুত এই কাণ্ডের হোতাগণ বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পাল্টাইয়া দিবার অপচেষ্টা চালাইয়াছেন। তাহাদের এই দুঃসাহস আমাদের যদ্রূপ বিস্মিত, তদ্রূপ বিক্ষুব্ধ করিয়াছে।

স্বাভাবিকভাবেই ডাকসু সংগ্রহশালা ঘিরিয়া এইরূপ অবিমৃষ্যকারিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুমুল ক্ষোভের সঞ্চার করিয়াছে। নাগরিক সমাজেও এহেন কার্য নিন্দা কুড়াইয়াছে। উহার প্রতিফলনস্বরূপ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় গিয়া জিন্নাহর ছবি ছিঁড়িয়া ফেলেন। ইতোমধ্যে ছাত্রদল, তৎসহিত বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠন ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি স্থাপনের প্রতিবাদে সোচ্চার হইয়াছে। একই বিষয়ে আপত্তি জানাইয়াছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও।

জিন্নাহ জোরপূর্বক তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের উপর মাত্র ৯ শতাংশ নাগরিকের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষারূপে চাপাইয়া দিবার চেষ্টাই শুধু করেন নাই; তাঁহার প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রই বাঙালির উপর ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ চালাইয়াছিল। তৎকারণেই স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের নিকট জিন্নাহর ভাবমূর্তি খলনায়কসম। অন্যদিকে, সেই পাকিস্তানি শাসন-শোষণবিরোধী সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে, পরবর্তী সময়ে বিশেষত তাঁহার এবং তাঁহার দলের শাসনামল সম্পর্কে যতই সমালোচনা থাকুক; এই দেশের জনগণের মনে বঙ্গবন্ধু মহানায়কের আসনে অধিষ্ঠিত। ইহাও বলা যায়, যতদিন বাংলাদেশ থাকিবে, ততদিন বঙ্গবন্ধুর এই মর্যাদা কেহই ক্ষুণ্ন করিতে পারিবে না। অথচ ডাকসুর নেতৃবৃন্দ আলোচ্য ঘটনাবলির মাধ্যমে উক্ত অপচেষ্টাই চালাইয়াছেন।
আমরা জানি, এক বৎসরের কিঞ্চিদধিক সময় পূর্বে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ভিন্ন ব্যানারে অংশগ্রহণ করিয়া ছাত্রশিবির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু নির্বাচনের পূর্বে মুক্তিযুদ্ধকে সমুন্নত রাখাসহ শিক্ষার্থীবান্ধব অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচিত হইয়াই তাহারা একাদিক্রমে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট হইয়া পড়ে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার নামে ডাকসুর নেতৃবৃন্দ হকার উচ্ছেদ কর্মসূচি গ্রহণ করে, যাহা বিপুল প্রতিবাদের মুখে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়। ডাকসুর একাধিক নেতার ভিন্নমতের শিক্ষকদের উপর মব সহিংসতা চালাইবার ঘটনাও কাহারও অজানা নহে। অতি সম্প্রতি শিক্ষকদের মূল্যায়নের নামে ডাকসুর বিতর্কিত উদ্যোগের কথাও এখানে উল্লেখযোগ্য। 

আশার কথা, অনুমোদনহীন এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে আপত্তি জানাইয়া সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ব্যক্ত করিয়াছে। তবে ইহাও বলা প্রয়োজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি সূচনাতেই ডাকসুর অনুমোদনহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ তৎপরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিত, তাহা হইলে আলোচ্য ন্যক্কারজনক ঘটনাবলি হয়তো ঘটিত না। আমাদের প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতি অনুসারে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুতই ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়ায় দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে।

আরও পড়ুন

×