ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কারা চিকিৎসা বেহাল

বন্দিদের মানবাধিকার নিশ্চিত করুন

বন্দিদের মানবাধিকার নিশ্চিত করুন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বিভিন্ন কারাগারে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম বৎসরের পর বৎসর বাক্সবন্দি থাকিবার ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। রবিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বিশেষায়িত কারা হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৪ বৎসর পূর্বে দুই ধাপে ৯ কোটি টাকা দিয়া এক্স-রে মেশিন, অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতি, এন্ডোস্কোপি, ইসিজি মেশিনসহ অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় করা হয়। ইহার পূর্বাপর চট্টগ্রাম, কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও খুলনা কারাগারের জন্য ক্রয় করা হয় আরও কয়েক কোটি টাকার অনুরূপ স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জাম। কিন্তু অদ্যাবধি সেইগুলি ব্যবহারের সুযোগ হয় নাই। তদুপরি দীর্ঘদিন বাক্সবন্দি থাকিবার কারণে অধিকাংশ সরঞ্জাম ব্যবহারের অযোগ্য হইয়া পড়িয়াছে।

এইদিকে, কারা অধিদপ্তরে অনুমোদিত দেড় শতাধিক চিকিৎসক পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র দুইজন। দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল হইতে ৮৭ জন চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ে আসিয়া প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা বন্দিদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন। এমনকি কারারক্ষীদের মধ্যে যাহাদের এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ ছিল এমন ৩৬ সদস্যকে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ হইতে প্রশিক্ষণ দিয়া চিকিৎসাসেবায় যুক্ত করা হইয়াছে। ‎‎ল্যাব টেকনিশিয়ানের অনুমোদিত ১৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র পাঁচজন। ডিপ্লোমা নার্সের ১০১টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে রহিয়াছেন মাত্র ৩১ জন। 
যেইখানে প্রয়োজনীয় জনবল অনুমোদিত নাই; এমনকি অনুমোদিত জনবলেরও অধিকাংশ পদ শূন্য, সেখানে যতই মূল্যবান হউক, যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত থাকা আশ্চর্যের কিছু নহে। উহাকে ঘোড়ার অগ্রে গাড়ি জুড়িবার পরিণাম বলিলেও সম্ভবত অতিরঞ্জন হইবে না। তদুপরি সরকারি দপ্তরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাবরই সর্বাগ্রে কেনাকাটায় অধিক আগ্রহী হইতে দেখা যায়। মূলত কমিশনপ্রাপ্তির সুযোগই যে এই ক্ষেত্রে প্রণোদনারূপে কাজ করে, তাহাও সকলের জানা।

তবে এই সকল তথ্যের মধ্যে কারাবন্দিদের প্রতি সরকারের সামগ্রিক বৈরী মনোভাব প্রকাশ পাইয়াছে, যাহা না বলিলেই নহে। আমরা জানি, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ, তৎসহিত দেশের সংবিধানেও কারাবন্দিরা কোনো অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হইলেও অন্য যে কোনো নাগরিকেরই অনুরূপ তাহাদের মানাবধিকার স্বীকৃত। এই প্রেক্ষাপটে গত কয়েক দশক যাবৎ বিশ্বের বহু দেশে কারাগারকে সংশোধনাগার বলা হইতেছে। এই দেশেও ইদানীং অনেকে তাহা অনুসরণ করিতে চাহিতেছেন। সেই হিসাবে কারাবন্দিদের স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের সুযোগের সহিত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক, বাস্তবে এখানে সামগ্রিক কারা ব্যবস্থাপনাই অনেকাংশে ঔপনিবেশিক আমলের ন্যায় বিদ্যমান। আরও বেদনাদায়ক বিষয়, বর্তমানে কারাগারসমূহের মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ সহস্র হইলেও সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদন মতে, কারাগারে দ্বিগুণেরও অধিক, অর্থাৎ বন্দির সংখ্যা এক লক্ষ অতিক্রম করিয়াছে। সেইখানে চিকিৎসার অভাবে, কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ হইতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৭ শতাধিক বন্দির মৃত্যু হইয়াছে। 

যাহা অধিকতর হতাশার বিষয়, দেশে-বিদেশে, বিশেষত মানবাধিকার সংগঠনগুলির পক্ষ হইতে কারাগারে ও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু লইয়া ধারাবাহিক উদ্বেগ প্রকাশিত হইলেও অদ্যাবধি কোনো সরকার তাহাতে ভ্রূক্ষেপ করে নাই। এমনকি বিশেষ করিয়া রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়া ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারও উক্ত ঔপনিবেশিক ধারায় ছেদ ঘটাইতেছে না, যাহা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য এক অশনিসংকেত। আমাদের প্রত্যাশা, কারাগারকে প্রকৃতই সংশোধনাগার জ্ঞান করিয়া সরকার সকল কারাগার এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিসমূহে দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করিবে, যেখানে বন্দিদের মানবাধিকারও অন্তর্ভুক্ত থাকিবে। 
কারাগারগুলির বাক্সবন্দি চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং শূন্য পদে ঝুলিতে থাকা স্বাস্থ্যসেবার এই বেহাল দশা কাটাইতে প্রয়োজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা। বন্দিদের নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগ ও অবকাঠামো সচল করিবার ব্যবস্থা লওয়া হোক।

আরও পড়ুন

×