ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কৃষি উপকরণ

সরিষার ভূত সারে

সরিষার ভূত সারে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৯

আমন মৌসুমে কৃষক চাহিদানুযায়ী সার পাইতেছেন না বলিয়া মাসাধিককাল যাবৎ সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যেই সংবাদ প্রকাশ হইয়া আসিতেছে; অদ্যাবধি উহার সুরাহা না হওয়া যথেষ্ট উদ্বেগজনক। সরকার পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলিলেও অধিক মূল্য না দিলে কৃষকের পক্ষে সার সংগ্রহ অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করিয়া শনিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, সারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৫টি পৃথক কর্মসূচি পালন করিয়াছেন কৃষকরা। কিছু স্থানে সারের গুদামও লুট হইয়াছে বিক্ষুব্ধ কৃষকদের দ্বারা। আমরা জানি, আকস্মিক বন্যা ও ডিজেল সংকটের কারণে এই বৎসর প্রধান ফসল বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম হইয়াছে। তৎসহিত জুলাইয়ে অতি ভারী বর্ষণ ও বন্যায় চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরবঙ্গে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আমনের বীজতলা ও আমন চারার ক্ষতি হইয়াছিল, যাহা আমন ধানের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে শঙ্কার মধ্যে ফেলিয়াছে। চলমান সার সংকট ঐ শঙ্কাকে বৃদ্ধি করিয়াছে। 

সার সংকট এমন সময়ে উদ্ভূত, যখন দেশে জ্বালানি সংকট ক্রমশ ঘনীভূত হইতেছে; বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংও জনজীবনকে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিয়াছে। পল্লি অঞ্চলে ১০-১২ ঘণ্টা বা ততোধিক সময় বিদ্যুৎ না থাকিবার কারণে পোলট্রির ন্যায় অসংখ্য ছোট শিল্প বন্ধ হইয়া গিয়াছে। এমতাবস্থায় আমন উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটিলে শুধু গ্রামীণ জনপদই অস্থির হইবে না; উহার প্রভাব নগরেও পড়িতে পারে। স্মরণে রাখিতে হইবে, এখনও চাউলের সিংহভাগ উৎপাদন করেন ছোট ও মাঝারি কৃষক; সংখ্যায় যাহারা বিপুল। তাহাদের অধিকাংশকেই পুঁজি সংগ্রহ করিতে হয় ঋণ করিয়া; ক্ষেত্রবিশেষে অত্যন্ত চড়া সুদে। অন্যদিকে, খুব কম ক্ষেত্রেই কৃষকরা ধানসহ তাহাদের উৎপাদিত ফসলের উপযুক্ত মূল্য পাইয়া থাকেন। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, পুরাতন ডিলারগণের একাংশ সার বিতরণ সম্পর্কিত সাম্প্রতিক নীতিমালা বাস্তবায়নে অসন্তুষ্ট হইয়া সার উত্তোলন ও বিতরণে অসহযোগিতা করিতেছে। আবার কৃষি মন্ত্রণালয়েরই সূত্র সমকালের নিকট দাবি করিয়াছে, নূতন নীতিমালা বাস্তবায়নে বিলম্বও সংকট সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখিয়াছে। অন্যদিকে, কুড়িগ্রাম অঞ্চলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক সার ডিলার সমকালকে জানাইয়াছেন, সার বিতরণ ব্যবস্থায় ‘প্রভাবশালী’ একটি মহল প্রভাব বিস্তার করিয়া চলিয়াছে। গুদামে সার আসিবার পর নির্দিষ্ট সংখ্যক বস্তা ওই মহলকে দিতে হয়, যাহা বেশি দামে বাহিরে বিক্রয় হয়। প্রভাবশালী বলিতে তিনি যে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীকেই বুঝাইয়াছেন– উহা বুঝিতে বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন নাই। বিদ্যমান সার সংকটে সরকার বিবিধ প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করিবার কথা বলিলেও পরিস্থিতির ইতরবিশেষ কেন ঘটিতেছে না, উহার কারণও লুক্কায়িত কথিত প্রভাবশালী মহলের প্রভাবে। এতদিন আমরা সরিষার মধ্যে ভূত দেখিয়াছি; এইবার উহা সারের মধ্যেও প্রবেশ করিয়াছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান যথার্থই বলিয়াছেন, গুদামে সার থাকা আর কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো অভিন্ন বিষয় নহে। কৃষক যদি ডিলারের গুদাম হইতে সার না পাইয়া পরে খোলাবাজারে বেশি দামে কিনিতে বাধ্য হন, তাহা হইলে শুধু জাতীয় মজুতের হিসাব দিয়া সংকটের দায় উপেক্ষা করা যায় না। আমরা দেখিতে চাহিব– পুরাতন বা নূতন ব্যবস্থা, যাহাই বলা হউক না কেন, সার বিতরণের প্রতিটি ধাপ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রহিয়াছে। সরকার আন্তরিক হইলে বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা কোথায়– চিহ্নিত করিয়া স্বল্প সময়ের মধ্যেই সমাধান নির্দেশ করিতে পারে। উহাই জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি।

দোষারোপের খেলায় কৃষকের হাতে সুলভে সার পৌঁছাইবে না; জাতিরও কোনো লাভ হইবে না। ইহাও স্মরণে রাখিতে হইবে, প্রতি কেজি সারে জাতীয় স্বার্থে রাষ্ট্রকে ভর্তুকি দিতে হয়; সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থার অভাবে সেই অর্থও কার্যকর কোনো ফল দিতেছে না।

আরও পড়ুন

×