ঢাকা রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খুলনায় শিক্ষার্থী হত্যা

আশপাশের মেস থেকে এসেও ছাত্ররা মারধরে যোগ দেন

আশপাশের মেস থেকে এসেও ছাত্ররা মারধরে যোগ দেন
×

আজমল হোসেন

খুলনা ব্যুরো

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:২৯

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) দুটি ছাত্র হলের পাশেই আবাসিক এলাকা। হলে যারা আসন পান না, তাদের বেশিরভাগই ওই এলাকায় ভাড়া থাকেন। খুবির খানজাহান আলী হল ফটকের বিপরীতে ইসলামনগর মসজিদ গলিতে সরোয়ার হোসেন নামে চারতলার একটি মেস। মেসের চতুর্থ তলায় অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকতেন নগরীর নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন।

গত শুক্রবার রাতে চুরির অপবাদ দিয়ে আজমুলকে বেদম মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে আজমুল চার তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে যান। হাসপাতালের নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। আজমল স্বেচ্ছায় ছাদ থেকে লাফ দিয়েছেন, নাকি মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে তা, নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সেদিন রাতেই নগরীর হরিণটানা থানায় মামলা করেছেন নিহতের বাবা কুতুব উদ্দীন। মামলার চার জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০/২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রায় দুই দিন অতিবাহিত হলেও জড়িত কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

আসামিরা হলেন- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি বিভাগের ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ওবায়দুল, গণিত ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী সাগর, ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী রবিন ও ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী মবিন। এর মধ্যে ওবায়দুল বাদে অন্যরা সাবেক শিক্ষার্থী।
এদিকে আজমুল হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আজ রোববার দুপুরে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছে খুবি শিক্ষার্থীরা। তারা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
আজ রোববার ভবনটিতে গিয়ে দেখা গেছে, চার তলা ভবনের প্রতিটি তলায় আটটি করে কক্ষ রয়েছে। চতুর্থ তলায় ডি-৮ কক্ষে থাকতেন আজমুল। ঘটনার পর থেকে ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার প্রতিটি কক্ষ তালাবদ্ধ। ভবনে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। তালাও নেই প্রতিটি তলার প্রবেশদ্বারে। ভবনটির নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার পাঁচজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। 
তারা জানান, ওই ভবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্র প্রায় চুরি হতো। অনেকের নতুন জুতা, টি-শার্ট, প্যান্ট, মোবাইল চুরি হয়েছে। ওই সড়কের অন্যান্য মেসেও প্রায় চুরি হয়। বিষয়টি নিয়ে সবাই কমবেশি বিরক্ত ছিলেন। তারা জানান, তৃতীয় তলার ৯ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে খাবার (মেস) খেতেন। বাকিরা বাইরে খাবার খান। মাঝে মাঝে তিন তলার বাসিন্দাদের রান্না করা খাবারও চুরি হতো।’ 

তৃতীয় তলার রান্নার কাজ করতেন প্রতিবেশী এক নারী। বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায় তাকে। ওই নারী বলেন, ‘আমি রান্না করে ভাত-তরকারি নয় ভাগ করে রেখে আসতাম। ভালো-মন্দ রান্না হলে ওই দিন খাবার পাওয়া যেত না। ছাত্ররা অনেকদিন আমাকে দোষারোপ করেছে। শুক্রবার রাতে ভাত এবং লাউ-মাছ রান্না করি। একজনের খাবার কম পরলে তারা আমার কাছে আবারও শুনতে এসেছিল।’ 

প্রত্যক্ষদর্শী এক যুবক জানান, এক প্লেট খাবার কোথায় গেল-এটা খুজঁতে ওই ভবনের সবার রুমে তল্লাশী চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। তখন আমাকেসহ স্থানীয় কয়েকজনকে নিয়ে তৃতীয় তলার ছাত্ররা সবার রুম চেক করে। চতুর্থ তলার ডি-৮ নম্বর রুমের খাটের নিচে কাপড় দিয়ে ঢাকা ভাতের প্লেট ও তরকারি পাওয়া যায়। কক্ষের তারে একজনের চুরি যাওয়া টি-শার্টও পাওয়া যায়। তখন তাকে অন্য ছাত্ররা মারধর শুরু করে। চোর ধরা পড়েছে শুনে আশপাশের মেস থেকেও ছাত্ররা এসে তাতে যোগ দেয়। একপর্যায়ে ছাদে নিয়ে তাকে আবারও মারপিট করা হয়। অনেকেই ছাত্রকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও পারেনি।

ওই ভবনের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘চোর ধরা পড়েছে শুনে আশপাশের মেসের লোকজনও ছাদে এসে আজমুলকে জিনিসপত্র ফেরত দিতে বলে। একপর্যায়ে তার বাবাকে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু প্রতিবেশী ছাদ থেকে পড়েছে আমরা জানি না।’

টাকা চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দীন। গতকাল শনিবার প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘রাত ১টার দিকে কয়েকজন ছেলে ফোন করে বলে আপনার ছেলে আমাদের অনেক জিনিস চুরি করছে, এখনই এক লাখ টাকা দিতে হবে। আমি বলি, আমি খুঁজতে দ্রুত পারি খুলনায় আসছি, এসে তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি। রাতেই বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে ট্রেনে সকাল ৬টায় ওর মেসে পৌঁছাই। তখন এলাকার এক মুরুব্বী জানায়, আপনার ছেলেকে ওই রুমের লোকজন পিটিয়ে মেরে ফেলছে।’

ভবনের মালিক সরোয়ার হোসেন হলেও সেটি দেখাশোনা করতেন তার জামাতা আকিবুর রহমান আকিব। তিনি জানান, প্রায় এক বছর আগে আজমুল মেসে ওঠেন। মেস ম্যানেজার মেহেদীই মেসের বিষয়টি দেখাশোনা করে। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মেহেদী ওই ভবনের চতুর্থ তলায় থাকতেন। অন্যদের সঙ্গে মেহেদীর রুমও তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে। তার মোবাইল নম্বরও বন্ধ।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আজমুল গতবছর খুলনায় এসে মেসে উঠেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পাওয়া সম্প্রতি তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

নর্থ ওয়েস্টার্নের ইংরেজি বিভাগের প্রধান মেহেদী হাসান জানান, ‘আজমুল গত ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এ পর্যন্ত সে মাত্র তিন দিন ক্লাস করেছে। মৃত্যুর খবর শুনে আমরা মর্গে গিয়ে তার পরিবার এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’

নগরীর হরিণটানার ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, ‘নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে। আমরা প্রতিটি তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা দ্রুত গ্রেপ্তার হবে। নিরীহ কেউ যাতে হয়রানি না হয়, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×