নির্বাচনী ব্যবস্থা
ডিসি-এসপিরা ইসির কথা মানবেন?
আমীন আল রশীদ
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০
পাঠকের মনে থাকার কথা, গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথদীঘি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলাকালে একটি ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে তর্কে জড়ান চিরঞ্জীব বড়ূয়া নামে পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শক। কেন্দ্র না ছাড়লে তিনি সাংবাদিকদের আটক করার হুমকি দেন। সাংবাদিকরা তাঁকে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে দায়িত্ব পালন এবং সংযত আচরণের পরামর্শ দিলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, 'আমি এসপি সাহেবের ডিউটি করছি। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মানার সময় নেই।' (প্রথম আলো, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১)।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ৮ অক্টোবর ডিসি-এসপিদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে যে ঘটনা ঘটল, তা গত বছরের ডিসেম্বরের ওই ঘটনাটি সামনে এনেছে। কেননা, এর পরদিন ৯ অক্টোবর সমকালের প্রধান শিরোনাম- 'মাঠ প্রশাসন থেকে ধাক্কা খেল নির্বাচন কমিশন।'
খবরে বলা হয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে 'নিরপেক্ষ আচরণ'-এর বার্তা দিতে মাঠ প্রশাসনকে ঢাকায় ডেকেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল তাঁর বক্তব্যে বেশ কিছু নির্দেশনাও দিয়েছেন। তবে ডিসি-এসপিদের সঙ্গে ইসির শীর্ষ কর্তাদের প্রথম যাত্রা সুখকর হয়নি।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান, যিনি নিজেও একজন সাবেক আমলা, নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে সৃষ্ট আস্থাহীনতার জন্য ডিসি-এসপিদের দায়ী করলে তিনি সম্মিলিত প্রতিবাদের মুখে পড়েন। এক পর্যায়ে কমিশনার আনিছ বলেন, তাহলে কি আপনারা আমার বক্তব্য শুনতে চান না? তখন সবাই একযোগে 'না' বলে উঠলে নিজের বক্তব্য শেষ না করেই তিনি বসে পড়েন।
মনে রাখা দরকার, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ ব্যক্তি যদি ভুল কিছু বলেও থাকেন, সেটির প্রতিবাদ করারও একটা রীতি বা ভাষা আছে। কিন্তু মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা একজন নির্বাচন কমিশনারকে কথা বলতে না দিয়ে, সম্মিলিতভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁর কথা শুনতে চান না বলে তাঁকে বসিয়ে দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন; সেটিই 'মর্নিং শোজ দ্য ডে'। কেননা, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ ব্যক্তিকে কথা বলতে না দিয়ে তাঁকে বসিয়ে দেওয়াটা সরকারি কর্মচারী আচরণবিধিরও লঙ্ঘন। এই ঘটনা প্রমাণ করে- মাঠ প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো কর্তৃত্ব নেই বা তাঁরা যদি নির্বাচন কমিশনের কথা না শোনেন তাতেও তাঁদের কোনো অসুবিধা হবে না। এটি একজন জেলা প্রশাসক যেমন জানেন, তেমিন জানেন পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শকও।
অস্বীকারের সুযোগ নেই, নির্বাচন কমিশন যতই নিরপেক্ষ থাকুক; নির্বাচন কেমন হবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করে ডিসি-এসপিদের ওপরেই। যদিও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অন্তত এক বছর দুই মাস আগে ডিসি-এসপিদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের যে বৈঠক হলো, এই সময়ের মধ্যে অনেকেই এ পদে থাকবেন না। অনেকের পদোন্নতি হবে। ফলে যে নির্দেশনা নির্বাচন কমিশন দিয়েছে, সেটি এ বৈঠকে উপস্থিত অনেকের জন্যই কোনো কাজে আসবে না। তারপরও নির্বাচন কমিশন মাঠ প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে এ ধরনের একটি বৈঠক করে সম্ভবত দেশের জনগণ, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং বিদেশিদের কাছে এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে- তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শতভাগ নিরপেক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব? যদিও তাঁদের যে আন্তরিকতা আছে; তাঁরা যে নিরপেক্ষ থাকতে চান- এই বার্তাটিরও একটা গুরুত্ব আছে।
একাডেমিক্যালি যতই বলা হোক- নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ থাকলে ভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়; সেটি বাংলাদেশের বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো ও সাংবিধানিক ব্যবস্থায় শতভাগ সত্যি নয়। এখানে একটা শুভংকরের ফাঁকি আছে। নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যতই দলনিরপেক্ষ, সৎ, সাহসী ও যোগ্য হোন না কেন; মাঠ প্রশাসন যদি না চায়, তাহলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ভোট কেমন হবে, সেটি নির্ভর করে যে সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে; তারা কেমন ভোট চায়, তার ওপর। মাঠ প্রশাসন যেহেতু সরকার তথা নির্বাহী বিভাগের অধীন এবং নির্বাচন কমিশনের কথা না শুনলে যেহেতু তাঁদের কোনো শাস্তির ভয় নেই কিংবা শাস্তি হলেও নির্বাহী বিভাগ থেকে তার 'সুরক্ষা' ব্যবস্থার যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে; মাঠ প্রশাসন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশের বাইরে যাবে না। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কী নির্দেশনা দিল, তার চেয়ে বড় কথা- সরকার বা নির্বাহী বিভাগ তাকে কী বলছে?
নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে বা থেকেছে; তারও মূল কারণ কেন্দ্রীয় সরকার তাদের ওপর ওই রকম নির্দেশনা দিয়েছে। যেহেতু বিশেষ কোনো প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার ম্যান্ডেট নির্দলীয় সরকারের থাকে না। ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা নিজেরা যেমন নিরপেক্ষ থাকতে পারে, তেমনি মাঠ প্রশাসনকেও নিরপেক্ষ থাকার নির্দেশ ও নির্দেশনা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের আদেশ তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানতে হয় বা মানা হয়ে যায়।
সুতরাং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে
রেখে নির্বাচন কমিশন মাঠ প্রশাসনকে যত নির্দেশনাই দিক না কেন, সেগুলো কতটুকু প্রয়োগ হবে বা তারা নির্বাচন কমিশনের কথা কতটুকু মানবে, সেটি নির্ভর করছে কোন ধরনের সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে।
সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা হচ্ছে- 'নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।' সে কারণে নির্বাচন চলাকালীন মাঠ প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এমনকি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ না করে নির্বাচন কাজে সংশ্নিষ্ট কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলিও করার বিধান নেই। বাস্তবে ভোটের সময় মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষ থাকতে না পারার পেছনে প্রধানত দায়ী স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব। সেই প্রভাব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যদি নির্বাচন কমিশনের না থাকে, তাহলে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা যাবে- সে সম্ভাবনা কম।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক
[email protected]
- বিষয় :
- নির্বাচনী ব্যবস্থা
- আমীন আল রশীদ
