জনস্বাস্থ্য
নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই টিকে থাকতে হবে
মুশতাক হোসেন
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ | ২২:২৭
করোনা ধরন বদলে টিকে আছে। এক ধরন থেকে নতুন উপধরনে পরিণত হচ্ছে এটি। নতুন ধরনের সংক্রমণে চীনসহ বিভিন্ন দেশে করোনা রোগী বাড়ছে। বিএফ ৭ নামের এ নতুন ধরন ওমিক্রনের চেয়েও সংক্রামক। এ ধরনে কম সময়ের মধ্যে রোগী আক্রান্ত হয়। তবে এ নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। এটি দ্রুত ছড়ালেও গুরুতর অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা কম। তাই বলে হাল ছেড়ে বসে থাকলে চলবে না। সংক্রমণ যাতে না হয় সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে সংক্রমণের হার কম হলেও শীত গেলে এটি বাড়তে পারে। এ জন্য স্বাস্থ্যবিধি জোরালোভাবে মেনে চলতে হবে। অফিস-আদালত তথা কর্মস্থলে মাস্ক ব্যবহারের পাশাপাশি সাবান পানি দিয়ে নিয়মিত হাত পরিস্কার করতে হবে। হাসপাতালের ক্ষেত্রে এটি বেশি জরুরি। চিকিৎসাকেন্দ্রে নানা ধরনের রোগী ও স্বজনের সমাগম ঘটে। তাই এখান থেকে যেন কোনো জীবাণু সংক্রমিত না হতে পারে সে জন্য কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা দরকার। হাসপাতালের দায়িত্বশীলদের বিষয়টি দ্রুত আমলে নেওয়া উচিত।
সর্দি-কাশি হলেই করোনা মনে করা উচিত নয়। শীতের দিনে অনেকেরই সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। এটা কমন কোল্ড। কিন্তু সর্দি-কাশির সঙ্গে জ্বর থাকলে অবশ্যই করোনা পরীক্ষা করাতে হবে। তা ছাড়া উপসর্গহীন কাউকে কাউকে করোনায় আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। আগের মতো ভয়াবহ না হলেও বিশ্বের কোনো কোনো দেশে করোনার উপদ্রব রয়ে গেছে। সব দেশের সঙ্গেই আমাদের নাগরিকের যাতায়াত থাকায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সম্প্রতি চীন থেকে আসা ব্যক্তির শরীরে নতুন ধরনের করোনার সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে আমি বলব, তারা কোন দেশ থেকে এসেছেন- পাবলিকলি বলা ঠিক হয়নি। শুধু দেশের নামই নয়; তারা কোন হাসপাতালে ভর্তি আছে, তাও বলে দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট করে কোনো দেশের নাম বলে দিলে একটি জাতির প্রতি আঙুল তোলা হয়। পাশাপাশি এতে কোনো কোনো বিদেশফেরত যাত্রীর মধ্যে তথ্য গোপনের প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
করোনা থেকে সুরক্ষা পেতে নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি টিকা নিতে হবে। বর্তমানে টিকার চতুর্থ ডোজ দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা এখনও দ্বিতীয়-তৃতীয় ডোজ নেননি তাঁদের উচিত দ্রুত এসব টিকা নিয়ে নেওয়া। যদিও অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে টিকা গ্রহণের হার সন্তোষজনক। আরও আগেই ৭০ শতাংশের বেশি নাগরিক টিকা নিয়েছেন। যাঁরা নেননি, তাঁদের দেওয়ার ব্যবস্থা করতে প্রচারণা চালাতে হবে। বয়স্ক এবং জটিল রোগে আক্রান্তদের মধ্যে যাঁরা এখনও টিকার ডোজ সম্পন্ন করেননি, তাঁরা অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গেলে ডাক্তারদের উচিত তাঁদের টিকা গ্রহণে আগ্রহী করে তোলা। করোনা যেহেতু বৈশ্বিক সংকট। তাই এটি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। টিকা এবং ওষুধের সমবণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিরাজ করছে। করোনার ঢেউ নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এটি মৌসুমি রোগ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু সে অবস্থায় না আসা পর্যন্ত এ মহামারিকে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই।
টিকার মেয়াদ নিয়ে দ্বিধার কোনো সুযোগ নেই। টিকার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তার সুযোগ নেই। টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ অনুযায়ী এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই টিকার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যে মেয়াদ মোড়কে উল্লেখ করে থাকে, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি থাকে। ফাইজারের টিকার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী। তা ছাড়া আমাদের দেশে বিভিন্ন কোম্পানির টিকা দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত টিকা নিয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। জ্বর, শরীর ব্যথা- এসব টিকা নেওয়ার পর বিচ্ছিন্নভাবে কারও কারও ক্ষেত্রে হতে পারে। কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে যাঁরা এখনও টিকা নেননি, তাঁদের উচিত দ্রুত টিকা নেওয়া।
করোনার বর্তমান ধরন আতঙ্কের কারণ না হলেও ভবিষ্যতে এটি ভয়াবহ হবে না- এমন কথা বলা যাবে না। তাই হাসপাতালে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু যে করোনা হলে এসব দরকার হয়, এমন নয়। শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্তদের জন্যও ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ দরকার। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বা অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধদের জন্যও দরকার হতে পারে। তাই দেশের সব হাসপাতালে এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। দগ্ধ রোগীদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চয়তা করা দরকার। এখন শীতকাল। আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি গরম পানিতে পুড়ে রোগীদের হাসপাতালে যেতে দেখা যাচ্ছে। এরই মধ্যে কারও কারও মৃত্যু হয়েছে।
আগুন পোহাতে গিয়ে কেউ যেন অগ্নিকাণ্ডের শিকার না হন, সে জন্য প্রচারাভিযান জোরদার করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে এগিয়ে আসতে হবে। যদিও এরই মধ্যে তারা সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সতর্ক করেছে। এটিকে নিয়ে আরও অগ্রসর হতে হবে। নিরাপদ চুলা ব্যবহারের পাশাপাশি আগুন পোহানোর সঠিক পদ্ধতি সাধারণ মানুষের মধ্যে তুলে ধরতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে এ ধরনের প্রচার চালালে সুফল আসবে।
করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুও রয়েছে। আক্রান্ত ও মৃতের হার কম হলেও তীব্র শীতের মৌসুমেও এটি রয়ে গেছে। বৃষ্টিপাত না থাকায় দ্রুত বংশবিস্তার করতে না পারলেও এডিস মশার প্রজননস্থল রয়ে গেছে। অনেক স্থানে পরিস্কার পানি জমে থাকছে। এতে নতুন করে এডিস মশা বংশবিস্তার করছে। তবে এটি নিয়ে গবেষণা করা দরকার-কেন ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। না হলে বর্ষা মৌসুমে এটি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনিতেই এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুতে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের যেমন উন্নতি হয়েছে, একই সঙ্গে নতুন রোগ সামনে আসছে। আবার গবেষণা করে এসব রোগের চিকিৎসা বের করা হচ্ছে। জনসাধারণ সচেতন হলে এবং সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চললে যে কোনো সংকট মোকাবিলা করা সহজ হয়।
ডা. মুশতাক হোসেন: রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)
- বিষয় :
- জনস্বাস্থ্য
- মুশতাক হোসেন
- করোনা
