ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

নির্বাচনী ব্যবস্থা

নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়

নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়
×

এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৩ | ১৮:০০

বরিশাল এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন শেষ হলো। এর মধ্যে বরিশালে এক প্রার্থী হামলায় আহত হওয়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি আবার চরমোনাইয়ের পীরের ভাইও বটে। তাঁর রক্তাক্ত হওয়ার ছবি দেখা গেছে। বরিশালে এর আগেও এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটেছে। এবারের ঘটনায় দায়ী ও দোষীদের খুঁজে বের করে বিচার না করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এটা করতে হবে। বরিশালের এই ঘটনা আরও বহুদূর যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে, সেখানে চরমোনাই পীরের অনুসারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। সেখানে তাদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে– এতে কোনো সন্দেহ নেই।

যে কোনো নির্বাচনে সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে। এখানে সিটি নির্বাচনে তো তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বলে দাবি করা যাবে না। বরিশালে আওয়ামী লীগের নৌকার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী তো চরমোনাই পীরের হাতপাখা। আমার কাছে যেটা মনে হয়– এখনও হাতপাখা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো অবস্থায় যায়নি। দলটি তাদের সমর্থকের পরিধি বিস্তৃত করতে পারেনি। একটি নির্দিষ্ট ধরনের সমর্থক নিয়েই দলটি এখন পর্যন্ত চলমান। তাই ভোটের মাঠে কেবল ভোট ছাড়াও আরও যেসব প্রভাবক থাকে, তা তাদের নেই। 

এই নির্বাচন নিয়ে যদি বলতে হয়, তাহলে যা হয়েছে তা দেখে নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী হতে পারছি না। এটা দিয়ে আগামী নির্বাচনের বিচার করা যাবে না। এই নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দল, যারা কিনা ভোটার টানতে পারবে, তারা নির্বাচনে নেই। এ ছাড়া বিএনপির সমমনা আরও রাজনৈতিক দল– তারাও নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সুতরাং সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। হয়তো দু-এক জায়গায় প্রতিযোগিতা হয়েছে। এটাকে ঠিক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলা যায় না।

এখন এই নির্বাচন দিয়ে যদি কেউ আগামী জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে মেলাতে চায়, সেটা ঠিক হবে না। সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট এবং দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে।

আমাদের এখানে মুশকিলটা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো পরিবারের বাইরে যেতে পারছে না। আবার ভোটারদের মানসিকতাও প্রার্থীদের পারিবারিক পরিচয় খুঁজে বেড়ায়। দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোতে এখন পরিবারের বাইরে প্রার্থী পাওয়া যায় না।

তবে সম্প্রতি শেষ হওয়া গাজীপুর সিটি নির্বাচনের বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে যিনি জয়ী হয়েছেন, তিনি সাবেক মেয়রের মা। এটা অবশ্য ভোট এবং সহানুভূতি পাওয়ার কারণ নয়। সেখানে আওয়ামী লীগ মনোনীত সাবেক মেয়র প্রার্থীকে দল এবং মেয়র পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এসব কারণেও মানুষের সহানুভূতি ছিল। আবার সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরের নিজেরও উল্লেখযোগ্য অনুসারী আছে। তিনি মেয়র হিসেবে এলাকায় কাজ করেছেন। পরে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁর প্রতি অনেকের একটা সহানুভূতি ছিল। আবার গাজীপুর একটি বড় আয়তনের সিটি করপোরেশন। সেখানকার আওয়ামী লীগবিরোধী ভোট জাহাঙ্গীরের মা পেয়েছেন। ফলে সেখানে নৌকার পরাজয় হয়েছে। 

বরিশাল বা খুলনায় এমন কোনো বিকল্প প্রার্থী দেখা যায়নি। জাতীয় পার্টিতে বিএনপির ভোটার যাঁরা আছেন, তাঁরা ভোট দেবেন না। বিএনপির বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাননি। যাঁরা গেছেন, তাঁরা কাউন্সিলর প্রার্থীর জন্য।  কাউন্সিলর ভোট যেমন হয়েছে, মেয়র পদের ভোট তেমন অংশগ্রহণমূলক হয়নি। তাই ভোটের হার যে খুব সন্তোষজনক হবে– এটা বলা যাবে না। এখন কমিশনের পক্ষ থেকে যতই বলা হোক, বিরূপ আবহাওয়া ছিল, তাতে পরিস্থিতির সত্য রূপ প্রকাশ করা হবে না। মানুষ ভোটের জন্য খুব একটা আগ্রহী বলেও আমার কাছে মনে হয় না। ভোটারদের পছন্দের প্রার্থী থাকলে এবং ভোটের ফলাফলের নিশ্চয়তা থাকলে মানুষ ভোটে আগ্রহী হতে পারে। এ ছাড়া ভোটার বৃদ্ধির আর কোনো পদ্ধতি তো নেই।
আবার খুলনার নির্বাচনের দিকে তাকালে ভোটাররা বুঝে যাচ্ছেন যে, এখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে না। একমাত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থীই এখানে ভোটের ময়দানে ছিলেন। আর কাউকে তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হিসেবে হাজির হতে দেখা যায়নি। তাই খুলনায় কেবল তাঁর সমর্থকরাই ভোট দিয়েছেন। আবার বরিশালেও প্রায় একই রকম দৃশ্য দেখা গেছে। তবে বরিশালে যেহেতু চরমোনাই পীরের প্রার্থী ছিলেন, সেখানে কিছু ভোটারের উপস্থিতি ছিল।

বরিশালের নির্বাচনে যেটি হয়েছে, একজন প্রার্থীকে শারীরিকভাবে হামলা করা হয়েছে। হামলার পর নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা দোষী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করবে। এখন দেখতে হবে, অপরাধীকে খুঁজে বের করে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এখানে নির্বাচনের দিন এমন ঘটনার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা তো নির্বাচন কমিশনের হাতেই রয়েছে। এই বিচার করতে গিয়ে তারা আবার পুলিশের ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে কিনা, সেটাও দেখতে হবে। নির্বাচনের মধ্যে এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য নির্বাচন আইনেই বিচারের বিধান রয়েছে। এ জন্য কমিশনের প্রশাসন বা পুলিশের ওপর নির্ভরশীল না হলেও চলবে। এখন দেখতে হবে কমিশন এটা কতখানি আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে।

বরিশালের যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি আমার ধারণা একটি অন্তঃকলহ বা নিজেদের দ্বন্দ্বমুখর পরিস্থিতির কারণে। বরিশালের আওয়ামী লীগের যিনি মেয়র প্রার্থী তিনি এবং আগের মেয়র একই পরিবারের। তাঁদের নিয়ে বিভিন্ন রকম সংবাদ আমরা এতদিনে জেনেছি। এখন ভোটের দিন এমন একটি ঘটনা ঘটিয়ে ভিন্ন রং দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা যেতে পারে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ বলছে, ‘হামলাকারীরা আমাদের লোক না’। অথচ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, বরিশালে বহিরাগতরা প্রবেশ করেছে। এখন প্রশ্ন হলা– এখানে বহিরাগতরা প্রবেশ করল কী করে? শুধু বহিরাগত হিসেবে প্রবেশ করেই তারা থেমে থাকেনি; একজন প্রার্থীর ওপর হামলাও করেছে।

আবারও বলি, সিটি নির্বাচন যেভাবে হয়েছে তা দিয়ে আগামী নির্বাচন সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যাবে না। যদি সময়মতো নির্বাচন হয়, তাহলে সেটি অন্তত এইভাবে হবে না, এটা বলা যায়। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্র আলাদা। সিটি নির্বাচনের সামনের ধাপ এখনও বাকি। আজকের বরিশালে হামলার পর চরমোনাই পীরের কাছ থেকে ফলাফল প্রত্যাখ্যান এবং রাজশাহী ও সিলেটের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তাই সেসব নির্বাচনও যে অংশগ্রহণমূলক হবে না– এটা এখনই বলা যায়। 

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল

আরও পড়ুন

×