দায়মুক্তির সংস্কৃতির বলি
সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান ফটকের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ছবি-সমকাল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম হত্যাকাণ্ড পুনরায় প্রমাণ করিল– দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। শুক্রবার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলানিউজ২৪ ডটকমের জামালপুর প্রতিনিধি এবং একাত্তর টিভির বকশীগঞ্জ প্রতিনিধি নাদিম ১৫ বৎসর যাবৎ স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মতে, অত্যন্ত সাহসী সাংবাদিক ছিলেন তিনি।
বুধবার রাত্রি ১০টার দিকে বকশীগঞ্জের বাসায় ফিরিবার পথে মোটরসাইকেলের গতি রোধ করিয়া ১৪-১৫ জনের একটি দল নাদিমকে এলোপাতাড়ি কিলঘুসি মারিয়া ও কোপাইয়া আহত করে। গুরুতর অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তথায় বৃহস্পতিবার তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
জানা গিয়াছে, স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, যিনি শাসক দলের স্থানীয় নেতাও বটে– বাবু এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়াছেন। এ ঘটনা পুনরায় দেখাইয়া দিল, সাংবাদিকতার শত্রুরা সাধারণত ক্ষমতাবলয়েরই লোক হয়। স্মরণ করা যাইতে পারে, ২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর সমকালের ফরিদপুর ব্যুরোপ্রধান গৌতম দাস এবং ২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের সমকাল প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুলও সাহসী সাংবাদিকতার কারণে ক্ষমতাবলয়ের লোকদের হস্তে খুন হইয়াছিলেন। এই কারণেই আসামি চিহ্নিত হইবার পরও অদ্যাবধি ভিকটিমদের পরিবার ন্যায়বিচার হইতে বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক ‘কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট’ প্রদত্ত তথ্যানুসারে, ১৯৯২ সাল হইতে বাংলাদেশে ৩২ জন সাংবাদিক নিহত হইয়াছেন। প্রশ্ন হইল, এহেন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাকারীদের দায়মুক্তি আর কতদিন চলিবে?
বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে কী প্রকারে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করা হইতেছে, উহা আমরা জ্ঞাত। মূলত এই আইনের কারণেই যে গত কয়েক বৎসর যাবৎ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রণীত সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের স্থান নিম্নদিকে যাইতেছে, উহা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিই বলিয়াছে। দুঃখজনক, এতৎসত্ত্বেও কালাকানুন বলিয়া ইতোমধ্যে চিহ্নিত আইনটি বাতিলে সরকারের মধ্যে খুব একটা হেলদোল পরিলক্ষিত হইতেছে না। সরকারের এহেন একগুঁয়ে মনোভাবই যে নাদিমের সম্ভাব্য খুনি বাবুর মতোন বিভিন্ন অপকর্মের সহিত যুক্ত শাসকদলীয় লোকদের বেপরোয়া হইতে দুঃসাহস জোগাইয়াছে– উহাও অস্বীকারের উপায় নাই।
আমাদের প্রত্যাশা, অন্তত নাদিম হত্যাকাণ্ড সরকারের টনক নড়াইবে এবং অবিলম্বে নাদিমের সকল খুনিকে গ্রেপ্তার করিয়া দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়া হইবে। সর্বোপরি, সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান মানিয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার পথের সকল বাধা দূর করা হইবে।
