ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

প্রভিডেন্ট ফান্ডেও নজর?

প্রভিডেন্ট ফান্ডেও নজর?
×

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০

চলতি অর্থবছর থেকে বেসরকারি কর্মচারী কল্যাণ তহবিল-প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটি তহবিল থেকে অর্জিত আয়ের ওপর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর বসছে। নতুন আয়কর আইনে এ বিধানটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি তহবিল ও শ্রমিকদের লভ্যাংশের তহবিলে করছাড় প্রত্যাহার করা হয়েছে।

কর্মীদের চাকরি-পরবর্তী সময়ের আর্থিক সুরক্ষায় প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ভবিষ্য তহবিল গঠনের বিধান আছে শ্রম আইনে। প্রতি মাসে বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে রাখা হয়। এই টাকার সঙ্গে সমপরিমাণ অর্থ দেয় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে গঠন করা হয় প্রভিডেন্ট ফান্ড। এখানে জমানো টাকা সঞ্চয়পত্র কেনাসহ নানা ধরনের লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে কোম্পানি। এই মুনাফা পরে কর্মীদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়। এতদিন এই মুনাফায় ১০ শতাংশ উৎসে কর আদায় করত এনবিআর। নতুন আইনে প্রভিডেন্ট ফান্ড স্বীকৃতি পেয়েছে কোম্পানি হিসেবে। ফলে এ ফান্ড নিয়মিত অডিট করে এনবিআরে রিটার্ন দিতে হবে। পাশাপাশি ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ।

আবার আমাদের দেশের কর রাজস্ব আয়ের বেশির ভাগ আসে শুল্ক ও ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর থেকে, যা সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কেনাকাটা করার সময় দিয়ে থাকে। কর আয়ের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ আয় আসে প্রত্যক্ষ আয়কর থেকে, যদিও উন্নত বিশ্বে তা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এবং ভারতে প্রায় ৫০ শতাংশ। বেসরকারি সংস্থা সিপিডির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ধনী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কর ফাঁকি বন্ধ করেই বছরে ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়তি আদায় সম্ভব, যা টাকার অঙ্কে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দের আট গুণ আর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের দ্বিগুণ। কিন্তু এনবিআর সবসময় আয় বাড়ানোর সহজ পথে হাঁটতে চায়। যারা কর দেন, তাদের ওপর বাড়তি কর বসানো হয়। কর আদায়ে অর্থনীতিবিদ স্মিথের নীতি হলো, করদাতা সামর্থ্য অনুযায়ী কর দেবেন। অর্থাৎ যার আয় বেশি তিনি বেশি হারে কর দেবেন। তাই নতুন করদাতা খুঁজে বের করে আয় অনুসারে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত বলে বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ মনে করেন।   

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভিডেন্ট ফান্ডে কর ধরা হলেও সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তেমনটা করা হয়নি। এনবিআরের এমন সিদ্ধান্তের কারণে বেসরকারি খাতে আগ্রহ হারাতে পারেন মেধাবীরা। চাকরি-পরবর্তী সময়ে ঝুঁকিতে পড়বেন অনেকেই। অথচ সম্প্রতি সরকার বেসরকারি খাতের মানুষের জন্য পেনশন স্কিম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা সামাজিক সুরক্ষার জন্য দীর্ঘদিনের চাওয়া ছিল। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। বেসরকারি চাকরিজীবীরা তাদের জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে বিভিন্নভাবে টাকা-পয়সার অভাবে বিড়ম্বনায় পড়েন। শেষ জীবনে তাদের সুরক্ষা একটি অপরিহার্য বিষয়। উন্নত দেশে সেই সুরক্ষা সরকার নিশ্চিত করে বলেই সেসব দেশে মানুষের অভিগমনের হার বেশি। অথচ আমাদের দেশে চাকরিকালীন বিপুল পরিমাণ কর দিয়েও কোনো পেনশনের ব্যবস্থা নেই। উপরন্তু বেসরকারি চাকরিদাতা ও কর্মী মিলে যে প্রভিডেন্ট ফান্ড গড়ে তোলেন, যা কর্মীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা কিছুটা হলেও নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপর সরকার ভাগ বসাতে চাইছে। সেটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বেসরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডের ওপর থেকে এই বৈষম্যমূলক কর অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক এবং বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রদত্ত আয়করের একটি অংশ তাদের অবসরকালীন পেনশন হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানাচ্ছি। আনোয়ার ফারুক তালুকদার: অর্থনীতি বিশ্লেষক   

আরও পড়ুন

×