ফিলিস্তিন
গাজার ‘হলোকাস্ট’ কেউ বন্ধ করবে না?
মুহাম্মদ জামিল
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৩ | ০৬:৩৪
একদিকে গাজাবাসীর ওপর ইসরায়েলি হামলার তীব্রতা বেড়েই চলেছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা পক্ষ হামলাকারীর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। এমনকি ইসরায়েলি যুদ্ধ মেশিন কয়েক হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও পশ্চিমাদের অবস্থানে নড়চড় নেই। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েলি দখল ও তাদের ‘আত্মরক্ষা’র অধিকারের ব্যাপারে পশ্চিমারা এক সুরে সোচ্চার। ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চলতে থাকলেও সেই সুর এখনও বেসুরো হয়নি।
গণহত্যা ও যুদ্ধ চালানোর ন্যায্যতা হিসেবে সরবরাহ করা সেসব খবর মিথ্যা প্রমাণ হওয়ার পরও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। যদিও হোয়াইট হাউস খবরের সত্যতার ব্যাপারে তাদের অবস্থান দ্রুত প্রত্যাহার করে নেয়; সংবাদমাধ্যমগুলো অযাচাইকৃত খবর প্রকাশের জন্য ক্ষমা চায়নি। উল্টো ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও ‘আত্মরক্ষা’ ন্যায্য করে তোলার চেষ্টায় আরও বেশি মনোযোগ দিয়েছে।
প্রায় ৭৫ বছর ধরে ইসরায়েলের দখলদার বাহিনী নির্দিষ্ট কোনো অজুহাত ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের ওপর হত্যাকাণ্ড চালিয়ে আসছে। নৃশংসতা ও হত্যাযজ্ঞের ওপরেই ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত। ইসরায়েল সন্দেহাতীতভাবে গাজায় হলোকাস্ট বা ব্যাপক গণহত্যা চালাচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব এবং এর সংবাদমাধ্যমগুলো ইচ্ছাকৃতই চোখ বন্ধ করে রাখছে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধ ফিলিস্তিনিদের হত্যা, মৃতদেহ পোড়ানো, মায়ের পেটের ভ্রূণ হত্যা, ধ্বংসস্তূপের নিচে মৃতদেহ, মসজিদ, গির্জা, হাসপাতাল ও স্কুল ধ্বংস করা এবং খাদ্য, পানীয় ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ করার মতো নৃশংসতার পরও পশ্চিমা বিবেক এতটুকু জাগ্রত হচ্ছে না। ইসরাইলের উন্মাদনার অবসান তারা ঘটাতে চাইছে না।
আল আহলি হাসপাতালে ইসরায়েলি বোমা হামলায় পাঁচ শতাধিক নিহত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যদিও কিছুটা মানবতাবাদী আচরণ দেখাতে চেয়েছিলেন; হাসপাতালে হামলার আগে প্রায় তিন হাজার ফিলিস্তিনি হত্যার ঘটনায় তিনি নীরব। তেল আবিব সফরের পর তাঁর সাময়িক সরবতা আবার সাবেক নীরবতায় রূপ নিয়েছে। তিনি ইসরায়েলি যুক্তি গ্রহণ করে গাজায় চলমান গণহত্যা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশে বিরত রয়েছেন।
ব্রিটেন ও ইউরোপের পাশাপাশি বাইডেন প্রশাসনও দৃশ্যত নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পূর্ণরূপে হারিয়েছে। তাদের জন্য অবশ্য এটি অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। যে রাষ্ট্রটি ধ্বংসাবশেষের ওপর প্রতিষ্ঠিত; তারা বিশ্বব্যাপী একাধিক গণহত্যা চালায়। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ইরাক ও আফগানিস্তান। জাতিসংঘে এবার দুটি প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ার পর গাজা উপত্যকার মানুষদের হত্যা ও উচ্ছেদ কার্যক্রমের অনুমোদন হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি খসড়া প্রস্তাব পেশ করে। সেখানে যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ না করে, মানবিক সহায়তার অনুমতি না দিয়ে বরং ‘দখলকারী বাহিনীর আত্মরক্ষার অধিকার’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাককে পার্লামেন্টের এক অধিবেশনে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি যুদ্ধ বন্ধের আহবান জানাবেন কিনা। কারণ ইসরায়েলের বোমায় বেসামরিক ও শিশুরা প্রতিদিন মারা যাচ্ছে। তিনি কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই বললেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার সুরক্ষার সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।’ তার মানে, আত্মরক্ষার নামে ইসরায়েলের বোমায় ফিলিস্তিনি শিশুসহ বেসামরিক নাগরিক মারা যাওয়ার বৈধতা দিচ্ছেন সুনাক? এটি কোন ধরনের ঔদ্ধত্য? এর মানে হলো, নিরীহ ফিলিস্তিনিদের যে রক্ত ঝরেছে, তা তাদের কাছে যথেষ্ট নয়। ইতোমধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৫ হাজারের বেশি আহত।
ইসলামী বিশ্ব ও আরব দেশগুলোও সে অর্থে এগিয়ে আসছে না। অবশ্য তারা সৌদি আরব ও মিসরে সম্মেলন করেছে, বিবৃতি দিয়েছে এবং আমরা তীব্র কণ্ঠ শুনেছি, কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। মিসর বলেছে, তারা ইসরায়েলের অনুমোদন ছাড়া রাফাহ ক্রসিং খুলতে পারবে না। কী লজ্জার কথা! মিসর এবং আরও কয়েকটি দেশের পক্ষে রাফাহ ক্রসিং খোলার ঘোষণা দেওয়া, সামরিক প্রহরায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি প্রদান, আহতদের সরিয়ে নেওয়া এবং বেশি দেরি হওয়ার আগেই জীবন বাঁচানোর জন্য চিকিৎসক ও নার্স আনা কি সম্ভব নয়? অথচ তাদের সামর্থ্য তো কম নয়।
বস্তুত ৫৭টি আরব ও মুসলিম দেশের নেতাদের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তারা আকুতি জানাচ্ছে– ‘এই যুদ্ধ বন্ধ করো’, ‘গাজাবাসীদের সাহায্য করো’। তারা মনে করছে, তাদের সরকারগুলো প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু তারা কি আদৌ সেটা করবে? গাজায় যখন হলোকাস্ট চলমান, এ অবস্থায় অলস বসে থাকা লজ্জাজনক। আমেরিকা প্রযোজিত ইসরায়েলি যুদ্ধ মেশিন থেকে গাজাবাসীকে রক্ষায় আমাদের সবাইকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
মুহাম্মদ জামিল: পরিচালক, আরব অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস, যুক্তরাজ্য, মিডল ইস্ট মনিটর থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- মুহাম্মদ জামিল
- ফিলিস্তিন
- হলোকাস্ট
