ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

নির্বাচনী ব্যবস্থার নাজুকতা ব্যবচ্ছেদ

নির্বাচনী ব্যবস্থার নাজুকতা ব্যবচ্ছেদ
×

প্রতীকী ছবি

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৪ | ২৩:৫৫

দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে কয়েক বিশিষ্টজন যে হতাশাব্যঞ্জক পর্যবেক্ষণ তুলিয়া ধরিয়াছেন, উহা সংগত বলিয়া মনে করি। রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি আয়োজিত ঐ সেমিনারে তাহারা যথার্থই বলিয়াছেন, সম্পূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থা এখন দুর্নীতিগ্রস্ত। আস্থাহীনতার কারণে একদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ হইতে বিরত থাকিতেছে, অন্যদিকে ভোটার উপস্থিতিও ক্রমহ্রাসমান। চলমান উপজেলা নির্বাচনসহ বিশেষত ২০১৪ সাল এবং তৎপরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত প্রায় সকল জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে এ মন্তব্যের যথার্থতা স্পষ্ট হয়। অথচ একদা দেশে স্থানীয় নির্বাচন তো বটেই, জাতীয় নির্বাচনও উৎসবমুখর হইত। প্রতিদ্বন্দ্বিতার যদ্রূপ অভাব হইত না, তদ্রূপ ভোটারদের উৎসাহেও ঘাটতি থাকিত না। অনস্বীকার্য, স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বৎসরের মধ্যে দেশে অগণতান্ত্রিক শাসন চাপিয়া বসে এবং তৎপরবর্তী অন্তত দেড় যুগ ছদ্মবেশে ও সরাসরি অনুরূপ শাসন চলে। ঐ ব্যবস্থাধীনে দেশে একটা শক্তিশালী নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছিল আকাশকুসুম কল্পনা। উপরন্তু ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তন করিলেও, অদ্যাবধি দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে চরম বৈরী সম্পর্কের কারণে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলমান, উহাও একটা কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক নহে। দুর্ভাগ্যবশত, প্রধান দুই দলের মধ্যে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতাসীন হইবার কিংবা থাকিবার বাসনা এতটাই উদগ্র, নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিজের পক্ষে লইতে উভয়েই সচেষ্ট।

স্বাভাবিকভাবেই এরূপ পরিস্থিতি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণাপুষ্ট কাহারও নিকট কাম্য নহে। কারণ ইহা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে; টেকসই উন্নয়নের জন্যও ক্ষতিকারক। শুধু উহাই নহে, জনগণের নিকট সামান্য জবাবদিহিও না থাকিবার কারণে এহেন পরিস্থিতিতে একদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্র দুর্নীতি ছড়াইয়া পড়ে, বহুবিধ বৈষম্য প্রকট রূপ ধারণ করে, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের নিয়ন্ত্রণ চলিয়া যায় কতিপয় শক্তিধর ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হস্তে। সর্বোপরি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা প্রবল রূপ ধারণ করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়া অর্জিত আমাদের সংবিধানে গণতন্ত্রের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারস্বরূপ প্রশাসনের সকল ইউনিট জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির দ্বারা শাসিত হইবার যে বিধান লিপিবদ্ধ, আলোচ্য পরিস্থিতি নিশ্চয় উহার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নহে।

আমরা জানি, এক সময়ে সংবিধানে প্রযুক্ত নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার বিধান অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিয়াছিল। কিন্তু এ জন্য দেশে প্রয়োজনীয় যে রাজনৈতিক সমঝোতা গড়িয়া উঠিয়াছিল, বিভিন্ন কারণে উহা অন্তত এক দশক পূর্বে ভাঙিয়া পড়িয়াছে। ফলে নির্বাচনকালীন সরকারবিষয়ক বিতর্ক অপেক্ষা বিদ্যমান নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনপূর্বক উহাকে শক্তিশালীকরণের উপায় অধিকতর মনোযোগ দাবি করে। গণতন্ত্রমনা সকল দল ও শক্তি যদি এতদ্বিষয়ে জনমত সংগঠনে মনোনিবেশ করে, তাহা হইলে দেশে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা দুরূহ নহে।

আরও পড়ুন

×