ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নদী অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের দায়-দায়িত্ব

নদী অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের দায়-দায়িত্ব
×

প্রতীকী ছবি

ড. মাসুদ পারভেজ রানা, এম আনোয়ার হোসেন, ড. তুহিন ওয়াদুদ, সুদীপ্ত শর্মা, নূসরাত খান, আলতাফ হোসেন রাসেল, ড. মুনতাহা রকিব, হানিয়্যুম মারিয়া খান, ড. রাশেদুজ্জামান পবিত্র ও শেখ রোকন

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২১ | ০৭:০২

প্রতিবছর নদী অধিকার দিবসে নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অভিন্ন বা আন্তর্জাতিক নদীর ওপর উজান ও ভাটির দেশের সমান অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৭ আগস্ট দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। নদীর পানির বণ্টন ও ব্যবস্থাপনায় যৌথ উদ্যোগ ও আলোচনার ক্ষেত্রে চলছে দীর্ঘসূত্রতা। নদীর অধিকার লঙ্ঘন ঠেকাতে বেশ কয়েক বছর ধরে জাতিসংঘের ‘কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য নন-নেভিগেশনাল ইউজেস অব ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কোর্সেস’ বা সংক্ষেপে ‘জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ ১৯৯৭’-এ বাংলাদেশের অনুসমর্থনের দাবি জানাতেই ২০১৫ সাল থেকে নদী অধিকার বিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপল দিবসটি পালন করে আসছে।

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের অর্থনীতি থেকে শুরু করে জীবন-জীবিকার প্রতিটি বিষয় ওতোপ্রোতভাবে নদীর অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত। আর তাই প্রতিটি নদীর নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহ রক্ষায় ভৌগোলিক সীমারেখার উর্ধ্বে উঠে বিশ্বের প্রতিটি দেশকে একত্রিত হবার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ। ১৯৯৭ সালের ২১ মে নদী বিষয়ক জাতিসংঘ প্রণীত এই কার্যকর দলিলটি প্রস্তাব আকারে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১০৬ ভোটে গৃহীত হয়। বাংলাদেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। নিয়ম অনুযায়ী ৩৫টি সদস্য দেশের অনুসমর্থনের ৯০ দিনের অব্যবহিত পর থেকে এটি কার্যকর হবে। ২০১৪ সালের ১৯ মে ভিয়েতনাম ৩৫তম দেশ হিসেবে এ সনদ অনুসমর্থন করে। ফলে, জাতিসংঘ মহাসচিব সনদটি পরবর্তী ৯০ দিবসের মধ্যে কার্যকর হওয়ার ঘোষণা দেন। সে হিসাবে ২০১৪ সালের ১৭ আগস্ট সনদটি কার্যকর হয়। বাংলাদেশ এখনও এই সনদে অনুসমর্থন দেয়নি। অথচ ভাটির দেশ হিসেবে নদীর স্বাস্থ্য এদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পাওয়ার কথা। জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ ১৯৯৭ যেকোন নদীবেষ্টিত দেশের জন্য একটি অব্যর্থ হাতিয়ার। উজানের দেশসমূহ তথা রাজনৈতিকভাবে বলশালী দেশগুলো আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব খাটিয়ে চলেছে  যুগের পর যুগ। এই অযৌক্তিক ধারা বজায় রেখে যারা ভাটির দেশগুলোকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়, আলোচ্য সনদটি তাদের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ আরও সংহত করার প্রয়াসে নদী অধিকার দিবস পালন করা হয় সম্মিলিতভাবে। 

উজানের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে এখনও কোন সুরাহা হতে দেখিনি আমরা। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায় প্রায় পাঁচ দশক কেটে গেছে। এরইমধ্যে বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদী, যা উজানে তিব্বত থেকে নেমে এসেছে ইয়ারলাং সাংপো নদী নামে, তার ওপর চীন তৈরি করতে যাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ তৈরির ড্যাম, যা ভারত ও একইসাথে বাংলাদেশের প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করবে। এই বৃহৎ প্রকল্প উৎপাদন করবে প্রায় ৬০ মিলিয়ন কিলোওয়াট অর্থাৎ ৬০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণে ভাটিঅঞ্চলে নদীর স্বাস্থ্যসুরক্ষার ক্ষয়ক্ষতি কিভাবে নিরূপণ করা হবে, তা নিয়ে ভাটির দু’দেশের হাতে নেই কোন পরিষ্কার বিশ্লেষণ। এমনকি এ ধরনের কাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে চীন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনাও করেনি। একটি নদীকে নির্দিষ্ট কোন দেশের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে না দেখে বরং পূর্ণাঙ্গ নদীব্যবস্থাকে বিবেচনায় এনে তার সুরক্ষায় সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ তৈরি করতে সহযোগিতা করবে জাতিসংঘের এই সনদ। 

নদীকে ইতিমধ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র জীবন্ত সত্ত্বা হিসেবে স্বীকৃতি জানিয়েছে। সুতরাং, প্রতিটি দেশকে অভিন্ন নদীর নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহের দাবিতে যে কোন নির্মাণ বা একচ্ছত্র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। প্রতিনিয়ত যে হারে নদী ধ্বংস করে চলেছে মানুষ, তা থেকে নদীকে রক্ষা করতে প্রতিটি দেশের সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে। আমরা যৌথ নদী কমিশনের মতো কার্যত নিষ্ক্রিয় কোন প্রতিষ্ঠান নিয়ে সন্তুষ্ট হতে চাইনা। নদীপ্রবাহে নায্যতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ভূমিকা দেখতে চাই জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদে অনুসমর্থনের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক পরিসরে পানি ও পরিবেশ বিষয়ে যেসব বিরূপ প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যে দৃশ্যমান এবং সেসব সমস্যা সমাধানে যেসব আইন-কানুন ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেসব বিষয় বিবেচনায় রেখে পানির আন্তর্জাতিক ন্যায্য ব্যবহার জাতিসংঘের মূলনীতির আলোকে সমাধান করার লক্ষ্য নিয়ে এই সনদ তৈরি হয়েছে বলে প্রস্তাবনায় দাবি করা হয়েছে। 

সনদের ২৭ নম্বর ধারায় বলা আছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে একক বা যৌথভাবে আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহকে সেসব অবস্থা থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যা প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট কারণে বন্যা, খরা, ভূমি ভরাট, ভূমিক্ষয়, লবণ পানির অনুপ্রবেশ, মরুকরণ বা পানিবাহিত রোগ সৃষ্টি করতে পারে। অতঃপর বর্তমান পৃথিবীর ভীষণ ক্রান্তিকালে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ঠেকাতে সবাই যার যার অবস্থান থেকে লড়াই করতে বদ্ধ পরিকর, তখন বাংলাদেশকে অনুধাবন করতে হবে নদীবৈচিত্র্য না রক্ষা করলে বাংলাদেশ বিলীন হয়ে যাবে। 

নিজের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই এদেশকে নদীর অধিকার সুরক্ষিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আর দেরি না করে অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ ১৯৯৭-এ অনুসমর্থন দেওয়া।

লেখকবৃন্দ নদী জলাভূমি ও পানিসম্পদবিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপল-এর সঙ্গে যুক্ত

[email protected]



আরও পড়ুন

×