ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

'নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই'

'নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই'
×

ফকির আলমগীর

সুরাইয়া আলমগীর

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০

গণমানুষের শিল্পী ফকির আলমগীর। তিনি যথার্থ অর্থেই ছিলেন বাংলা ও বাঙালির শিল্পী। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে তার ৭১তম জন্মদিন উদযাপিত হয় গাজীপুরের হোতাপাড়া বৃদ্ধাশ্রমে, তারই ইচ্ছানুসারে। আগামী জন্মদিনটি উদযাপন করতে চেয়েছিলেন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের সঙ্গে। সে আশা অপূর্ণই থেকে গেল। ২৩ জুলাই তিনি চলে গেলেন। এখনও ভাবতে অনেক কষ্ট হয়। আমার মতো তার ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীরা মেনে নিতে পারেন না- ফকির আলমগীর নেই। এত সামর্থ্যবান, প্রাণোচ্ছল ও কর্মঠ ফকির আলমগীর এই সুন্দর পৃথিবীতে নেই- ভাবতেও কষ্ট হয়। পবিত্র ঈদুল আজহার পরই আমাদের দু'জনের আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল। ভাগ্যের পরিহাস।
এখনও লেখার টেবিলে একশ বছরপূর্তি উপলক্ষে লেখা- পিছন ফিরে চাইলে একশো বছর কথা কয়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলমের ক্যাপটি এখনও খোলা। করোনাকালে বেশিরভাগ সময় কেটেছে লেখালেখি করে। সাংবাদিকতায় ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর করা ফকির আলমগীর গান গেয়েছেন গণসংগীতের, চাকরি করেছেন ৩০ বছর বিসিআইসিতে (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন)। গণযোগাযোগ বিভাগে সফলতার সঙ্গে মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি নিয়ে এলপিআরে আসেন ২০০৭ সালে। দীর্ঘ জীবনের পথপরিক্রমায় পৃথিবীর বাংলাভাষী মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। পেয়েছেন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক, বাংলা একাডেমির ফেলোশিপ, জসীম উদ্‌দীন স্বর্ণপদক, পশ্চিমবঙ্গের সম্মাননা (সংগীতে) (২০১৫ সাল) পেয়েছেন একজন সফল সংগঠক হিসেবে।
ফকির আলমগীর ১৯৭৬ সালে গঠন করেন অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে 'ঋষিজ', যা সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে পথচলার এক ভ্যানগার্ড। প্রায় ৪৪ বছর ধরে অত্যন্ত কাছে থেকে দেখা মানবতার গায়ক এ গুণী মানুষকে। যতই দেখেছি ততই বিস্মিত হয়েছি।
নিরলস সংগ্রামী, অকুতোভয়, নির্ভীক এ শিল্পী এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের শিল্পী, অবয়বেই যার পরিচয়। হাজারো মানুষের মাঝে ঝাঁকড়া চুলের উন্নত নাসিকা শ্যামল বর্ণের এ গণগায়ককে জনগণ অনায়াসে চিনে ফেলতেন। অত্যন্ত নিরলস, পরিশ্রমী এ গুণীকে ক্লান্তি কখনও পরাভূত করতে পারেনি। গণসংগীতের আদর্শগতভাবে লৌহকঠিন এ মানুষটি মনের দিক থেকে অত্যন্ত নরম ছিলেন। স্নেহবৎসল পিতা, প্রেমময় স্বামী, স্নেহময় দাদা ছিলেন। পরনিন্দা, পরচর্চা, ধূমপান থেকে সব সময় বিরত থেকেছেন তার গানের উদ্ৃব্দত কথামালার মতোই। সব সময় জন্মদিনে শিশুর মতোই থেকেছেন। পরিবার-আন্তঃপ্রাণ এ সফল মানুষটি জীবনের চলার পথের বাঁকে বাঁকে অনেক কঠিন পরিস্থিতি ও সংগ্রামমুখর জীবনের সঙ্গে একাই লড়াই করেছেন। নিজের চড়াই-উতরাইয়ের জীবনযুদ্ধে একাই লড়তে লড়তে হয়েছেন বিজয়ী; হয়েছেন সফলকাম।
পদ্মা-পাড়ের মানুষ ফকির আলমগীর। পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে, উজান স্রোতে শত প্রতিকূলতায় একমাত্র নিজের প্রচেষ্টায় কোনো রকম সহযোগিতা ছাড়াই ফকির আলমগীর দেশজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক, একজন সফল লেখক। এ পর্যন্ত তার লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২৫টি। পবিত্র হজব্রত পালন করেন ২০১৯ সালে। প্রায় অনেক দিন ধরে লিখে চলেছেন পবিত্র হজব্রত নিয়ে বই- 'ইহরাম থেকে আরাফাত'। মৃত্যুর ২০-২৫ দিন আগে প্রকাশিত এ বইখানি দেখে যেতে পেরেছেন। অধ্যাত্মবাদের আবেগের সঙ্গে যুক্তিযুক্ত জীবনবাদী চেতনার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি এবং স্বকীয়তা বজায় রেখে চলেছেন। তিনি গণমানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থেকেই তা করতে পেরেছেন।
বাঙালি ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে যেন কণ্ঠশিল্পী আমাদের জাতীয় জীবনের সন্ধিতে ক্রোধ, ক্ষোভ ও জনসমর্থনের বাণী কণ্ঠে ধারণ করে বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়ী ভূমিকা পালন করেন। যার বলিষ্ঠ কণ্ঠে ধারণ করা আছে গণসংগীত; এর নায়ক, উপমহাদেশের কিংবদন্তি এ শিল্পী বেঁচে থাকবেন। তিনি বেঁচে থাকবেন গণসচেতনার সংগ্রামী অমর সৃষ্টি জন হেনরি, ম্যান্ডেলা, দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, নূর হোসেন, ভয়কি মরণে, মানুষের মাঝে বসবাস করি, মায়ের একধার দুধের দাম, মুজিব আমার স্বপ্নসহ অসংখ্য অর্থবহ গানের মধ্য দিয়ে। বেঁচে থাকবেন খেটে খাওয়া মুটে-মজুরের শ্রমের ঘামে। বেঁচে থাকবেন শত শত সখিনার নিকানো উঠানের ভালোবাসার ফসলের ঘ্রাণে পদ্মা-পাড়ের সন্তান। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, শ্রমিকের অধিকারের বিপ্লবী কণ্ঠস্বর, মানুষের গায়ক, মানবতার গায়েন- এক গণমানুষের মুকুটহীন সম্রাট ফকির আলমগীর। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কবিগুরু যথার্থই বলেছেন, 'নয়নসমুখে তুমি নাই,/ নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই'।
প্রয়াত ফকির আলমগীরের পত্নী

আরও পড়ুন

×