বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
‘পুশইন’ গ্রহণযোগ্য নহে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের যেই বৈঠক আগামী সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে সূচিত হইতে যাইতেছে, উহা উভয় দেশের জন্য গুরুতপূর্ণ। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির সূত্র উদ্ধৃত করিয়া মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, পুশইন তথা কথিত বাংলাদেশিদের বেআইনিভাবে ঠেলিয়া পাঠাইবার বিষয়টি সেই আলোচনায় গুরুত্ব পাইবে। এমন এক সময়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হইতেছে যখন পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত বিজেপি সরকার অনুপ্রবেশকারীরূপে দাগাইয়া দিয়া অনেক মানুষকে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হস্তে তুলিয়া দিতেছে। এমনকি কথিত অনুপ্রবেশকারী এবং অবৈধ অভিবাসীদের রাখিবার জন্য প্রতিবেশী আসাম রাজ্যের অনুকরণে জেলায় জেলায় ডিটেনশন সেন্টারও খোলা হইয়াছে। অতএব বিষয়টির আশু সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।
প্রসংগত, আসামে দীর্ঘ ও বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই শেষে ২০১৯ সালে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি হইতে (এনআরসি) ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়। জাতিতে বাঙালি ওই সকল মানুষ অনেককেই ডিটেনশন সেন্টারে অন্তরীণ রাখা হয়। সরকারের পক্ষ হইতে বলা হয়, উক্ত বাদ পড়া মানুষ নিজেদেরই প্রমাণ করিতে হইবে– তাহারা অবৈধ বাংলাদেশি নহেন; ভারতের নাগরিক। তখন ঐ সকল মানুষ অনেককে বাংলাদেশে ঠেলিয়া পাঠানো হইতে পারে– এমন শঙ্কা প্রবল হইয়াছিল। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পূর্বে ভোটার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের নামে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় যেই লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকার বাহিরে রাখা হইয়াছে, তাহাদের লইয়াও অনুরূপ পুশইনের খেলা শুরুর আশঙ্কা প্রবল। শুধু উহাই নহে; উক্ত নির্বাচনের পূর্বেও ভারতের বিভিন্ন রাজ্য হইতে বাংলাভাষী শ্রমজীবী মানুষদের ধরিয়া সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়া বাংলাদেশে ঠেলিয়া পাঠানোর চেষ্টা চলিয়াছে; কিছু ক্ষেত্রে উহারা সফলও হইয়াছিল। তখন দেখা গিয়াছিল, উক্ত বাংলাভাষী অনেকেই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা, যাহাদের একটা সময়ে ভারত সরকার দুই দেশের মানবাধিকারকর্মী এবং তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চাপে ফিরাইয়া লইতে বাধ্য হইয়াছিল।
স্বীকার করিতে হইবে, অভিবাসন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে তো বটেই, এক দেশ হইতে অনেক দূরবর্তী দেশেও স্বাভাবিক ঘটনা। প্রাগৈতিহাসিক আমল হইতেই বিভিন্ন বাস্তব কারণে তাহা ঘটিয়া আসিতেছে। উপরন্তু ইতিহাস-সচেতন ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করিবেন, শত শত বৎসর একই শাসন ব্যবস্থার অধীনে থাকিবার কারণে বাংলাদেশ-ভারতে এমন বহু পরিবার আছে যাহাদের আত্মীয়স্বজন দুই দেশেই বিস্তৃত। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে বৈধ পথে তো নহেই, অবৈধ পথেও জনচলাচল একেবারে অস্বাভাবিক নহে। এই কারণেই দুই দেশেই জনগণের পাশাপাশি সরকারের মধ্যেও বৈধ চলাচল সহজ করা এবং অবৈধ চলাচল বন্ধের বিষয়ে আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ বরাবর দেখা গিয়াছে। বিশেষত দুই দেশের মৎস্যজীবীদের পরস্পরের জলসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা আকছার ঘটিয়া থাকে। আবার আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এহেন বহু ঘটনা ইতোমধ্যে নিরসনও করা হইয়াছে। আমরা মনে করি, স্থল সীমান্তপথে অনুপ্রবেশের সমস্যা একই পদ্ধতিতে নিরসন করা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বিশেষত ভারত সরকারের তরফ হইতে বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ এই বিষয়ে অনীহা দৃশ্যমান। তদুপরি, নিছক ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কথিত অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণের ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী সরকারের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে।
আমরা জানি, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটিলেও বর্তমান সরকার সম্পর্ক মসৃণ করিতে তৎপর। অনুরূপ আন্তরিকতা ভারত সরকারও দেখাইলে আলোচ্য সমস্যার অবশ্যই শান্তিপূর্ণ সমাধান মিলিবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
