ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত বাংলাদেশি

দালাল চক্র চিহ্নিত, ব্যবস্থা আবশ্যক

দালাল চক্র চিহ্নিত, ব্যবস্থা আবশ্যক
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১১:৪৯

দশ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া উচ্চ বেতনের চাকুরিপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় রাশিয়ায় গিয়া কিশোরগঞ্জের যুবক জাহাঙ্গীর হোসেনকে যে দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি বরণ করিতে হইয়াছে, উহা বিরল কোনো ঘটনা না হইলেও বেদনাদায়ক। স্বজনদের তথ্য উদ্ধৃত করিয়া রবিবার সমকাল জানাইয়াছে, জাহাঙ্গীর ১০ লক্ষ টাকা ঋণ করিয়া ঢাকার একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সির মাধ্যমে গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া যান। সেখানে তাঁহার উচ্চ বেতনে হোটেলে চাকুরি হওয়ার কথা ছিল।

বাস্তবে তাঁহাকে শূকরের একটি খামারে কাজ দেওয়া হয়, যেখানে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করিলেও খাবার মিলিত না প্রয়োজনমতো। উক্ত কর্ম ত্যাগ করিতে চাহিলে পুনরায় মানসম্পন্ন কর্মের প্রতিশ্রুতি দিয়া কাগজে স্বাক্ষর রাখিয়া জাহাঙ্গীরকে গত ১২ এপ্রিল নিয়োগ দেওয়া হয় রুশ সেনাবাহিনীতে। সেখানে প্রশিক্ষণ শেষে তাঁহাকে যাইতে হয় ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে গত ১৮ মে এক মাইন বিস্ফোরণে তিনি প্রাণ হারান। ইহার সহিত দেশে রাখিয়া যাওয়া মাতা, স্ত্রী ও অনুজ ভ্রাতা-ভগ্নির জন্য উন্নত জীবন নিশ্চিতকরণের যে স্বপ্ন জাহাঙ্গীর দেখিয়াছিলেন, তাহারও করুণ সমাপ্তি ঘটে।

শুধু উহাই নহে; জাহাঙ্গীরকে অকালে হারাইয়া তাঁহার পোশাক শ্রমিক মা উক্ত ১০ লক্ষ টাকা ঋণ কীভাবে পরিশোধ করিবেন, সেই চিন্তায়ও দিশাহারা। ঘটনাটি বিরল নহে। কারণ একই ঘটনায় জাহাঙ্গীরের সহিত মাদারীপুরের সুরুজ কাজী ও কুমিল্লার ইউসুফ খান নামক দুই যুবক নিহত হন। উপরন্তু সর্বশেষ মৃত্যুসহ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা ৩৯-এ উপনীত বলিয়া জানাইয়াছে একাধিক সংবাদমাধ্যম। 

ইহা কাহারও অজানা নহে, অসহনীয় দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণে আমাদের তরুণেরা প্রায়শ যে কোনো উপায়ে বিদেশে গিয়া অর্থোপার্জনের জন্য বেপরোয়া হইয়া উঠেন। ইহার সুযোগ গ্রহণ করে দালালরূপী আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের দেশীয় সদস্যরা। এই চক্রে পড়িয়া বিগত বৎসরগুলিতে বিশেষত লিবিয়া বা কম্বোডিয়ায় গোপন বন্দিশিবিরে উক্ত তরুণেরা সীমাহীন নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হইয়াছেন। উক্ত বন্দিশিবির হইতে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়া অনেক ভুক্তভোগীর দেশে অবস্থানকারী স্বজনদের নিকট হইতে অতিরিক্ত অর্থও আদায় করা হইয়াছে। তদুপরি লিবিয়া হইতে রাবারের নৌকায় করিয়া ইতালিতে লইয়া যাইবার পথে ঝঞ্ঝাসংকুল ভূমধ্যসাগরে ইতোপূর্বে বহু বাংলাদেশির সলিল সমাধি ঘটিয়াছে। তবে দুঃখজনক, ইতোমধ্যে এহেন অসংখ্য হৃদয়বিদারক ঘটনায় ইউরোপে গমনে স্বপ্নভঙ্গ হইলেও দালালদের দৌরাত্ম্য যদ্রূপ হ্রাস পাইতেছে না, তদ্রূপ দালালদের মিথ্যা প্রলোভনে ভুলিবার মানুষেরও অভাব হইতেছে না। সর্বোপরি সরকারও এহেন মৃত্যুর মিছিল থামাইতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ লইতেছে না। আমরা মনে করি, বিনা হস্তক্ষেপে উক্ত ভূমধ্যসাগরীয় ট্র্যাজেডি দশকের পর দশক চলিতেছে বলিয়াই আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্র পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় কম জৌলুসপূর্ণ রাশিয়া এবং প্রায় জৌলুসহীন কম্বোডিয়ামুখী মানব পাচারের নূতন নূতন রুট খুলিতে পারিতেছে। 

কিশোরগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক বলিয়াছেন, জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাইলেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাহার স্বজনদের সহায়তা দেওয়া হইবে। তবে বিদেশে চাকুরি দেওয়ার নামে এহেন ঘৃণ্য প্রতারণা বন্ধ করার লক্ষ্যে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলের জাগ্রত হইবার সময় সমাগত। দ্রুত ঐ সকল চক্রের দেশীয় দালালদের চিহ্নিত করিয়া কঠোর শাস্তির আওতায় আনিতে হইবে। তৎসহিত এই বিপদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জনসচেতনতা গঠনের কার্যকর উদ্যোগও লইতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, আলোচ্য প্রতারণা ও জীবনহানি সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলিকে মহাবিপর্যয়ে নিপতিত করে, যে পরিবারগুলি প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত অংশের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, এই সকল ঘটনা সমাজের স্থিতিশীলতার জন্যও ক্ষতিকর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও ইহারা ম্লান করিয়া দেয়।

আরও পড়ুন

×