ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ক্রমবর্ধমান মব সন্ত্রাস

অনতিক্রম্য অন্ধকার

অনতিক্রম্য অন্ধকার
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

জনমনে উদ্বেগ ছড়াইয়া মব সন্ত্রাস দুর্ভাগ্যবশত, অদ্যাবধি অব্যাহত। রবিবার প্রকাশিত মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) মাসিক প্রতিবেদন অনুসারে, সদ্য সমাপ্ত মে মাসে দেশে ৩২ জন এই বর্বরতার শিকার হইয়া প্রাণ হারাইয়াছেন, যাহা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গত এপ্রিলে এই সংখ্যা ছিল ২১, যাহা গত বৎসরের ডিসেম্বরে ছিল ১০, জানুয়ারিতে ২১, ফেব্রুয়ারিতে ১৮ এবং মার্চে ১৯। উপরন্তু আইন স্বহস্তে তুলিয়া লইবার প্রবণতা বৃদ্ধির স্মারকরূপেও আহতের সংখ্যা এপ্রিলের ৪৯ হইতে বৃদ্ধি পাইয়া মে মাসে ৭১-এ উপনীত। বলিয়া রাখা প্রয়োজন, মব সহিংসতার প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হইবার আশঙ্কা বর্তমান। কারণ এমএসএফের হিসাবটি কেবলই বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে নির্ণীত। অন্য লঘু ও গুরুতর অপরাধের ন্যায় মব সহিংসতার খবরও বাস্তব কারণে সর্বাংশে সংবাদপত্রে আসে না। একই কারণে অপরাধের ঘটনার সংখ্যা বলিতে গিয়া বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মধ্যেও পার্থক্য দেখা যায়। হতাশাজনক হইল, অরাজকতার স্মারক এহেন পরিস্থিতির অবনতি এমন সময়ে ঘটিতেছে যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারংবার মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রায় যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া আসিতেছেন। বিষয়টি সংসদেও বেশ কয়েকবার আলোচিত হইয়াছে। গত ১০ মে পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলিয়াছিলেন, মব সহিংসতা দমনে সরকার প্রয়োজনে বিদ্যমান আইন সংশোধন বা নূতন আইন প্রণয়ন করিবে।

অনস্বীকার্য, গণপিটুনিতে হতাহতের ঘটনা দেশে নূতন নহে। অতীতে বহুবার এহেন ঘটনাবলি জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দিয়াছে। তবে বর্তমানে যেই ধরনের মব সহিংসতা চলিতেছে তাহা শুধু সংখ্যায় নহে, বৈশিষ্ট্যের বিচারেও সম্পূর্ণ ভিন্ন। অতীতে যেইখানে মুখ্যত ধারাবাহিক বিচারহীনতার সংস্কৃতিজনিত হতাশা এবং নিছক সন্দেহের বশবর্তী হইয়া কাহারও বিরুদ্ধে জনসাধারণ আইন স্বীয় হস্তে তুলিয়া লইত, এখন মব সহিংসতার নামে কার্যত পরিকল্পিত সন্ত্রাস চলিতেছে। বিশেষ বিশেষ মহল তাহাদের অপছন্দের বা বিরোধী পক্ষের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু বানাইয়া যেই কোনো অজুহাতে মব সন্ত্রাস ঘটাইয়া চলিয়াছে। 
স্মরণ করা যাইতে পারে, মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর হইতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই প্রকার মব সহিংসতা ছড়াইয়া পড়ে। উহার লক্ষ্যবস্তু ছিল প্রধানত বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, এমনকি সংখ্যাগুরু ধর্মের সুফিবাদী ও মাজারপন্থি মানুষ। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী তো বটেই; অনেক নিরীহ মানুষকেও আওয়ামী দোসর আখ্যা দিয়া এহেন সহিংসতার শিকার বানানো হইয়াছে। সংস্কৃতিকর্মী এবং নারীরাও ধারাবাহিকভাবে অনুরূপ আক্রমণের শিকার হইয়াছেন। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার এই সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য-সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের ঘোষণা দিলেও কার্যত উহার পৃষ্ঠপোষকতাই দিয়া আসিতেছিল। এই হতাশাজনক পরিস্থিতি হইতে মুক্তি পাওয়ার অভিপ্রায়ে ভুক্তভোগীরা তো বটেই, সাধারণ মানুষও তখন একটা নির্বাচিত সরকারের জন্য ছিল অপেক্ষমাণ। তাই অদ্য যখন একই মব সহিংসতা চলিতেছে তখন মানুষ গভীরতর হতাশায় নিমজ্জিত হইতে পারে, যাহা রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।

নির্বাচিত সরকারকে ইহা উপলব্ধিতে লইতে হইবে– মব সন্ত্রাস একদিকে রাষ্ট্র ও সমাজকে চূড়ান্ত আইনহীনতার মধ্যে নিমজ্জিত করিতে পারে, অন্যদিকে চলমান দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে করিতে পারে বিলম্বিত। সর্বোপরি সর্বগ্রাসী সংকটের দিকে দেশ ধাবিত হইতে পারে। তাই সরকারকে অবিলম্বে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি হইতে বাহির হইয়া আসিতে হইবে। এই অবস্থায় গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী সমাজের সচেতন অংশকেও সোচ্চার হইতে হইবে বলিয়া আমরা মনে করি।

আরও পড়ুন

×