পুলিশের উপর হামলা
মনোবল বৃদ্ধি ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণ জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর হামলাগুলি দেখিয়া সচেতন মানুষমাত্রই উদ্বিগ্ন না হইয়া পারেন না। শনিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসে অদ্যাবধি ঢাকাসহ ৯ জেলায় ১৩টি স্থানে হামলা হইয়াছে, যথায় আহত হইয়াছেন পুলিশ ও র্যাবের ৩২ সদস্য। উপরন্তু গত চার মাসে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর আরও ২১৩টি হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে এবং পৃথক ঘটনায় সিলেট ও চট্টগ্রামে প্রাণ হারাইয়াছেন পুলিশ ও র্যাবের দুই সদস্য। যাহাদের উপর অপরাধ দমন করিয়া সাধারণ নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব, তাহারাই যখন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকেন, তখন বিষয়টা উদ্বেগজনক না হইয়া পারে না।
মনে রাখা প্রয়োজন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এমন এক সময়ে চলিতেছে, যখন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্বাপর সময়ে বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি হইতে লুটকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটা অংশ অদ্যাবধি পুনরুদ্ধার হয় নাই। উপরন্তু সেই সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ চিহ্নিত সন্ত্রাসীর সহিত বিভিন্ন প্রকার অপরাধীর হস্তগত হইয়াছে বলিয়া সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হইয়াছে। অর্থাৎ জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এহেন অসহায়ত্ব এক অশনিসংকেত।
প্রতিবেদনে উক্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের যেই মত প্রকাশিত হইয়াছে, উহাতে সঠিকভাবেই বলা হইয়াছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় ‘মব’ ও হামলার শিকার হয় পুলিশ। যাহার কারণে পুলিশের মনোবল ভাঙিয়া পড়িয়াছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে, এক হিসাবে, পুলিশ ৮৩৪টি হামলা মোকাবিলা করিয়াছে। আবার সেই সময়ে যেইভাবে কারণ-অকারণে শাসক মহল এবং উহাদের আশীর্বাদধন্য ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পক্ষ হইতে অপছন্দের ব্যক্তিমাত্রকেই পূর্বতন আওয়ামী লীগ সরকারের ‘দোসর’ বা সমর্থকরূপে দাগাইয়া দিয়া হেনস্তার রীতি প্রায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, উহারও নেতিবাচক প্রভাব পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর উপর পড়িয়াছিল। অনেক পুলিশ সদস্য মামলা, সংযুক্তি, প্রত্যাহার ও চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতির শিকার হইতে পারেন– এমন আতঙ্কেও ভুগিতেন। তাই পুলিশের পক্ষে ঘুরিয়া দাঁড়ানো এক প্রকার অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছিল। দুর্ভাগ্যবশত, অন্তর্বর্তী সরকার বাহিনীটিকে এহেন ট্রমা হইতে বাহির করিবার প্রতিশ্রুতি বারংবার দিলেও কার্যত কিছুই করে নাই। এমনকি বর্তমান নির্বাচিত সরকারও অদ্যাবধি এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি ঘটাইতে পারে নাই। ফলে বাহিনীটি এখনও সম্পূর্ণরূপে ঘুরিয়া দাঁড়াইতে সক্ষম হয় নাই। এই অবস্থা অপরাধীদের নিকট একটা মওকারূপে হাজির হইয়াছে। উহারা মনে করিতেছে, পুলিশ এখনও দুর্বল অবস্থানে রহিয়াছে; হামলা করিলে কিছুই হইবে না। তদুপরি বাহিনীর আত্মবিশ্বাসে এহেন ঘাটতির মধ্যেই অনেক পুলিশ সদস্যকে ক্ষেত্রবিশেষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ব্যতিরেকেই অবৈধ অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার অভিযানে প্রেরণ করা হইতেছে। ফলে এই পরিস্থিতিতে যাহা ঘটিবার তাহাই ঘটিতেছে। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হতাহত হইতেছেন।
শুধু উহাই নহে, এমতাবস্থায় সরকারি দলের নেতাকর্মীরা যখন অপরাধে সংশ্লিষ্ট হইতেছেন, তাহাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ চিরাচরিত কায়দায় ইতস্তত বোধ করিতেছে। খোদ সরকারপ্রধান বলিয়াছেন বটে– পুলিশকে দলমত নির্বশেষে অপরাধীমাত্রই গ্রেপ্তার করিতে হইবে; কিন্তু অভিযোগ, অতীতের ন্যায় এখনও দেশের বহু থানায় সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের অনাপত্তি ব্যতীত পুলিশ এমনকি মামলাও গ্রহণ করিতে পারিতেছে না।
আমরা মনে করি, বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইন অনুসারে চলার স্বাধীনতা প্রদান। প্রয়োজনে ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশ আইনে পরিবর্তন আনয়ন এবং বাহিনীকে পুনর্বিন্যাস করা যাইতে পারে। তবে উহার সহিত বাহিনীটিকে পুলিশ কমিশন বা কোনো স্বাধীন কর্তৃপক্ষের অধীনে ন্যস্ত করাও জরুরি।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
