আবহাওয়ার সতর্কবার্তা
তাপদাহ মোকাবিলায় ‘শীতল’ প্রস্তুতি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে গত কয়েক দিবস যাবৎ উত্তপ্ত আবহাওয়ার যেই লক্ষণ দৃশ্যমান, উহাতে তাপদাহের আশঙ্কা অমূলক নহে। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত ‘তাপদাহের বহুমুখী প্রভাব, প্রস্তুতি কম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের সম্মুখে চ্যালেঞ্জ হইল তাপপ্রবাহ, খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত। তৎসহিত সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করিয়া তুলিতে পারে। চলতি জুনের শুরুতেই রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চলসহ দেশের অধিকাংশ জেলার উপর দিয়া মৃদু তাপপ্রবাহ শুরু হইয়াছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিবস এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকিতে পারে। তজ্জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে।
আমরা জানি, দেশের অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্য উৎপাদনসহ শ্রমনির্ভর জীবনযাত্রা সরাসরি আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল। শক্তিশালী এল নিনো তৈয়ার হইলে দেশে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি, খরা, ফসলহানি, পানি সংকট এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাইতে পারে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ তাপপ্রবাহের ভয়াবহতা দেখিয়াছে, যখন দেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ তাপপ্রবাহ দেখা গিয়াছিল। টানা ৩৬ দিবস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩৬ হইতে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করিয়াছিল। তৎকালে এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখিতে হইয়াছিল। হিট স্ট্রোক ও পানিশূন্যতায় অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছিল। যথায় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল শ্রমিক শ্রেণি এবং নিম্ন আয়ের মানুষ। কৃষি শ্রমিক ও দিনমজুরেরা তাপদাহের কারণে প্রাত্যহিক কাজে যাইতে না পারায় তাহাদের উপার্জন প্রায় বন্ধ হইয়া গিয়াছিল।
তাপদাহের যেই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা করিতেছেন, উহা হইতে সুরক্ষায় তাই প্রস্তুতি জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। তাপপ্রবাহকে প্রাকৃতিক দুর্যোগরূপে স্বীকৃতির যেই দাবি উঠিয়াছে, উহা আমলে লওয়া প্রয়োজন। তৎসহিত আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং জলবায়ুসহিষ্ণু অবকাঠামো গড়িয়া তুলিবার উদ্যোগ লইতে হইবে। তাহা না হইলে ভবিষ্যতে ইহার অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য আরও অধিক হইতে পারে। তজ্জন্য তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। এই ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বরাদ্দ দিতে হইবে, যাহাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।
আমরা দেখিয়াছি, জলবায়ুর পরিবর্তন লইয়া দেশের অধিকাংশ পরিকল্পনায় উপকূলীয় অঞ্চল গুরুত্ব পাইলেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকির বিষয় উপেক্ষিত রহিয়াছে। তজ্জন্য নগরাঞ্চলে বৃক্ষরোপণ ও জলাধার বৃদ্ধি করিয়া তাপমাত্রা হ্রাসে ব্যবস্থা গ্রহণের ন্যায় আবশ্যক বিষয় গুরুত্ব পাইতেছে না। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী অবশ্য সমকালকে বলিয়াছেন, সরকার তাপমাত্রা হ্রাসে নগরে বনায়ন ও বৃক্ষরোপণের উপর জোর দিয়াছে। ম্যানগ্রোভ বাগান সম্প্রসারণসহ সামাজিক বনায়নের আওতায় চারা রোপণের যেই কর্মসূচি সরকার গ্রহণ করিয়াছে, উহা নিঃসন্দেহে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাপপ্রবাহের প্রভাব মোকাবিলায় ইহা যথেষ্ট নহে। এই ক্ষেত্রে সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে লইতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে খরা ও লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কৃষকদের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি বীমা প্রবর্তন করা যাইতে পারে। কৃষক ও শ্রমিকের স্বার্থও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগাম ব্যবস্থাপনাও জরুরি।
বলা বাহুল্য, ইহা কেবল জাতীয় বিষয় নহে; জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইহাকে বৈশ্বিক জলবায়ুর জন্য জরুরি সতর্কবার্তারূপে উল্লেখ করিয়াছেন। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও অনুরূপ সতর্কতার কথা বলিয়াছে। তজ্জন্য তাপদাহ মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সহায়তাও মিলিতে পারে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
