ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন বন্ধ না হয়

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন বন্ধ না হয়
×

ড. কাজী ছাইদুল হালিম

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ০৫:১৯ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ০৫:১৯

করোনাভাইরাস অতিমারির কারণে ২০২০ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ মাসের ১২ তারিখ থেকে পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়া হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এতে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে প্রতিটি বিদ্যাপীঠ। এখন প্রয়োজন সতর্কতার সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করা।

মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগ অর্থাৎ এটা একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে ছড়ায়। কোনো স্থানে দলবদ্ধভাবে মিথস্ট্ক্রিয় অবস্থান করোনাভাইরাস সংক্রমণের উপযুক্ত ক্ষেত্র। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের মিলনস্থান। তাই হয়তো করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার কিছুটা বেড়ে যেতেও পারে। আর তাহলে আতঙ্কিত হওয়া উচিত হবে না। সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে যে, সংক্রমণের বর্ধিত হার (যদি হয়) কতটা ক্ষতিকর এবং এটা কীভাবে কমানো যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি নির্দেশনাগুলো যথাযথ পরিপালনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া।

মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একেকটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। একজন বেড়ে ওঠা মানুষের ভবিষ্যৎ গঠনের চারণভূমি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানুষের সমাজে টিকে থাকার দক্ষতা অর্জনের আধার; মানবিক দক্ষতা, সামাজিক দক্ষতা, কর্ম দক্ষতা, মিথস্ট্ক্রিয়ার দক্ষতা এবং আরও অনেক কিছু। আর এ জন্যই সর্বাধিক চেষ্টা করতে হবে যে কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যায়। সেজন্যই সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আমার বর্তমান কর্মস্থল ফিনল্যান্ডে এখন করোনাভাইরাসের চতুর্থ ঢেউ প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী বছরের শুরুতে আবার পঞ্চম ঢেউয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করছে কর্তৃপক্ষ। এ জন্যই সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিনিশ সরকার। বারো এবং তার বেশি বয়সীদের জোরেশোরে করোনার টিকা দেওয়া শুরু করেছে সরকার। ইমিউনিটি কমায় যারা ঝুঁকিতে আছে তাদেরও তৃতীয় ডোজ টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। অক্টোবরে ৮০% এর বেশি মানুষের দুই ডোজ করে টিকা নিশ্চিতের পর করোনার ফলে অর্পিত বেশিরভাগ বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ফিনল্যান্ড সরকার। ফিনিশ সরকার দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। যখন এই বিষয়ে লিখছি তখন ফিনিশ সংবাদে শুনলাম, সরকার খুব শিগগির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে যাতে করে টিকার পেছনে শিক্ষার্থীর ছুটতে না হয়, টিকাই পৌঁছে যাবে শিক্ষার্থীর কাছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের হয়তো করোনা মোকাবিলায় ফিনল্যান্ডের মতো একই গতিতে এগোনো সম্ভব হবে না। তবুও বলব, করোনার টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকদূরই এগিয়ে গেছে। আগামীতে টিকাদানের গতিকে আরও দ্রুত করা যায় কীভাবে তার ওপর কাজ করতে হবে। শিক্ষাদান যেমন একটা অভ্যাস তেমনি শিক্ষাগ্রহণও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শিক্ষক সমাজ এবং বিদ্যার্থীদের মধ্যে বিদ্যাদান এবং বিদ্যা আহরণের ক্ষেত্রে নেতিবাচক অভ্যাসগত পরিবর্তন অতি স্বাভাবিক। যার প্রভাব সমাজকে দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াতে হবে। সরকারকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে কীভাবে শিক্ষার সঙ্গে জড়িতদের অতিদ্রুত টিকাদানের আওতায় আনা যায়।

দুর্ভাগ্যবশত করোনার তৃতীয় ঢেউ যদি আগামীতে বাংলাদেশে শুরু হয়েই যায়, তবুও বলব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন আর বন্ধ না হয়। বিকল্প কোনো সৃজনশীল পন্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অভিমুখী বিদ্যার্থীদের স্রোত (যত কমই হোক) বন্ধ যেন না হয়। এটাও মনে রাখতে হবে, করোনার আগামী ঢেউগুলো আগের মতো এতটা শক্তিশালী না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটা হচ্ছে, মানুষ এখন করোনাভাইরাস সম্পর্কে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞাত এবং সচেতন। দ্বিতীয়ত, টিকাদান প্রক্রিয়া প্রতিদিনই এগিয়ে যাচ্ছে এবং আগামীতে এটা আরও দ্রুতগতিতে এগোবে। তৃতীয়ত, বিশ্ববাজারে করোনার টিকা অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য।

করোনাভাইরাস অতিমারি সবাইকে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে শারীরিক ইমিউনিটির গুরুত্ব কতটা। যাদের ইমিউনিটি ভালো তারা সাধারণত করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সেরে উঠছে, দুর্বল ইমিউনিটি যাদের তারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইমিউনিটি ভালো করার ক্ষেত্রে শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শরীরচর্চা অনেকটাই অনুপস্থিত। করোনা অতিমারি থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার আলোকে শরীরচর্চাকে কি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করা যায় না? এটা ভাবার সময় এসেছে এখন!


আরও পড়ুন

×