ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

স্মরণ

বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা এবং ব্র্যাক

বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা এবং ব্র্যাক
×

স্যার ফজলে হাসান আবেদ [২৭ এপ্রিল ১৯৩৬-২০ ডিসেম্বর ২০১৯]

জুলিয়ান ফ্রান্সিস

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৪:৫৯

সময়টা ছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাস। আমি তখন ভারতের বিহার প্রদেশে অক্সফ্যামের অর্থায়নে ও মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে গড়ে তোলা গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচিতে কৃষি ও পশু পালনবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছিলাম। ভারতের সবচেয়ে উষ্ণ স্থান গয়ায় বসে কিছু স্থানীয় বাঙালি বন্ধু মারফত বাংলাদেশের ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন ও সহিংসতার সংবাদ পাচ্ছিলাম আমরা।

একাত্তরের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ যুদ্ধ [স্বাধীনতা] ঘোষণা করার পর থেকে অক্সফ্যামের পূর্ব ভারতীয় কার্যালয়ে টেলিগ্রামে হাজারো মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে ঢুকে পড়ার সংবাদ আসতে লাগল।

আমাকে তখন বিহারের সহকর্মীদের নিয়ে দ্রুত কলকাতায় চলে আসতে বলা হলো। তারপর ত্রিপুরা থেকে কলকাতা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া ছয় লাখো নারী-পুরুষ ও শিশু শরণার্থীর জন্য যে বিপুল ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, তার সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলো আমাকে।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করার পর অক্সফ্যাম এখানকার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হয়। রেমন্ড ক্যোরনোয়ার ছিলেন অক্সফ্যাম বাংলাদেশের প্রথম আবাসিক পরিচালক। তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। ত্রাণ ও পুনর্বাসন নিয়ে তার চিন্তাভাবনা ছিল আলাদা। 'কারিতাস এবং মাদার তেরেসাকে ত্রাণের জিনিসপত্র দিয়ে দিন', রেমন্ড বলেছিলেন। 'আমি বাংলাদেশের তরুণদের নিয়ে কাজ করতে চাই যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন রয়েছে।'

রেমন্ড বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে স্থলপথে কলকাতা থেকে ঢাকায় এলাম আমি। যাত্রাপথজুড়ে জ্বালিয়ে দেওয়া গ্রামের পর গ্রাম, ধ্বংস করে দেওয়া সেতু আর কালভার্ট এবং পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া ফেরি ও লঞ্চের দৃশ্য। অনেক পোড়-খাওয়া ত্রাণ কর্মকর্তারই সেদিন বিশ্বাস ছিল জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ হয়তো টিকে থাকতে পারবে না যদি না খাদ্য সরবরাহ ও যাতায়াত ব্যবস্থার পুনঃপ্রচলন অতি দ্রুত নিশ্চিত করা যায়।

বাংলাদেশ থেকে ঘুরে আসার অল্প কিছুদিন পর কলকাতার পার্ক সার্কাসে আমার অফিসে এসে হাজির হলেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। অক্সফোর্ডে অক্সফ্যামের হেড অফিসের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। হেড অফিসের আদেশমাফিক আমি তার হাতে তিন লাখ রুপি (২৩ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড) তুলে দিলাম। এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশে সহজলভ্য নয় এমন কিছু প্রয়োজনীয় সরবরাহ তার কেনার কথা। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে অক্সফ্যাম-ইউকে ও অক্সফ্যাম-কানাডার মিলিত ১,৩২,১৭৪ ব্রিটিশ পাউন্ড অনুদান ব্র্যাকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। এটাই ছিল সংস্থাটিকে দেওয়া অক্সফ্যামের প্রথম অনুদান যা দিয়ে বীজ, সার, নৌকা, মাছ ধরার সরঞ্জাম, অন্যান্য হাতিয়ার, ওষুধ, কর্মীদের বেতন, যানবাহন ও ৬,০০০ বাড়ি তৈরির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানানো হয়েছিল। সিলেটের শাল্লায় পরিচালিত এই কার্যক্রম ছিল ব্র্যাকের প্রথম উন্নয়ন কর্মকা। পরবর্তীকালে অক্সফ্যামের অর্থায়নে দেশের অন্যত্রও জনস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, সাক্ষরতা অভিযান ও নারী উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়েছিল।

১৯৭০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রত্যেক বছর আমি হয় বাংলাদেশে বসবাস এবং কাজ করেছি, নয়তো ভ্রমণ করেছি। তখন থেকে এমন কোনো বছর যায়নি যে আমি বাংলাদেশে ছিলাম না। আমার জন্য ব্র্যাকের বিকাশ দেখতে পাওয়াটা ছিল এক চমৎকার অভিজ্ঞতা। আশির দশকে ব্র্যাকের মাঠপর্যায়ের কাজ যখন দেখতে যেতাম, আবেদ ভাই সব সময় আমার কাছে জানতে চাইতেন- 'কেমন দেখলেন? কীভাবে আরও ভালো কাজ করা যায়?' সব সময় গঠনমূলক সমালোচনা চাইতেন তিনি। ব্র্যাকের কাজের উঁচু মান বজায় রাখার পেছনে নিঃসন্দেহে সংস্থাটির গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের বড় ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যর্থতা থেকেও মূল্যবান শিক্ষা গ্রহণেও এই বিভাগ ভূমিকা রেখেছে।

আমার সৌভাগ্য, ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক উন্নয়ন বিভাগ ডিএফআইডি এবং অস্ট্রেলিয়ার বৈদেশিক উন্নয়ন বিভাগ ডিফ্যাটের সঙ্গে ব্র্যাকের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির নতুন পর্যায়ের প্রস্তুতিতে সাহায্য করার আমন্ত্রণ পাই আমি। এই কাজের সূত্রে টেকসই উন্নয়নের বহুবিধ ক্ষেত্রে একযোগে ব্র্যাকের দক্ষতার প্রসার ও গভীরতা সম্পর্কে ধারণা করার সুযোগ হয়েছিল আমার। ১৯৭২ সালের কঠিন দিনগুলো থেকে বাংলাদেশের আজকের এই বিকাশের যাত্রায় ব্র্যাকের কার্যক্রমের অবদান যে কতটা ব্যাপক তারও একটা ধারণা পাই আমি সে সময়।

ব্রিটিশ মানবহিতৈষী জুলিয়ান ফ্রান্সিস মুক্তিযুদ্ধে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। সে সময় তিনি অক্সফ্যামের ভারতে পরিচালিত ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন যেটি ৬০টি শরণার্থী শিবিরে ছয় লাখ নারী-পুরুষ ও শিশুর কাছে জরুরি মানবিক সাহায্য পৌঁছে দিচ্ছিল। এই লেখায় তিনি সংকটকালীন সেই সময় এবং ব্র্যাকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন।

আরও পড়ুন

×