ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

'বন্দুকযুদ্ধ' নিয়ে আমরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি

'বন্দুকযুদ্ধ' নিয়ে আমরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি
×

মোজাম্মেল হোসেন

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০

আমার স্কুলজীবনের এক বন্ধু সরকারি চাকরিতে অতিরিক্ত সচিব পদে কাজ করে অবসর নিয়েছেন কয়েক বছর আগে। আমরা দু'জনই খুব বইপড়ূয়া ছিলাম। বন্ধুটি আমার চেয়ে বেশি। সখ্য এখনও অটুট।
২০২০ সালের মাঝামাঝি করোনা মহামারির দুর্দিনে ঘরে আটকা থাকায় আমাদের মধ্যে মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে লিখে কথা চালাচালি হতো; যাকে হাল আমলের ডিজিটাল ইংরেজিতে চ্যাটিং বা টেক্সটিং বলে। গত মঙ্গলবার সিনহা হত্যা মামলার রায় সব সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে সেই বন্ধুর একটি কথা মনে পড়ল। মুঠোফোনের স্ট্ক্রিনে পশ্চাদ্গমন করে দেখলাম সে বছর ৮ আগস্ট আমাদের লিখিত বাক্যালাপের অংশ। তার অল্পদিন আগে ৩১ জুলাই কক্সবাজার-টেকনাফের মেরিন ড্রাইভে চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। খুব চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হচ্ছিল এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে। আমাদের দুই বন্ধুর এলোমেলো বাক্যবিনিময়ে হঠাৎ চলে আসে এ প্রসঙ্গ। সেই অংশটি এ রকম-
আমি :কোরআনের তাফসিরের নামে ওয়াজ মাহফিলে এখন রাজনীতি আর চলতি সব ঘটনা নিয়ে বক্তৃতা হয়।
বন্ধু :সেটাই তো স্বাভাবিক। তবে ওয়াজগুলো চিরকালই রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে এসেছে।
আমি :না। বাল্যকালে শুনেছি, তখন সংখ্যায় সারা বছর এত বেশি ওয়াজ হতো না, যা হতো প্রধানত ধর্মীয়। রাজনীতি যেটুকু বলা হতো তা মুসলমানদের অধিকারের কথা পাকিস্তান আন্দোলনের প্রভাবে। এখন তো মার্ডার কেস, ক্রিকেট খেলা, আলোড়ন তোলা নাটক-সিনেমা, ট্রাম্প, চীন, করোনাভাইরাস এইসবের ওপরই জোর বেশি। নিহত সিনহা আর্মি (সাবেক) হওয়ায় বিভিন্ন মহলের উৎসাহ বেশি।
বন্ধু :সিনহার ঘটনাটি রাষ্ট্রের গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। গণতান্ত্রিক কাঠামো বাদ দিয়ে দায়বদ্ধতাহীন পুলিশি শাসন-নির্ভরতা এই সংকট সৃষ্টি করেছে।
আমি :অবশ্যই। ক্রসফায়ার যার অন্যতম উপাদান।
পরস্পর একান্তে মতবিনিময় করলেও এই ভাবনা ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে আমি তখন উপসম্পাদকীয় লিখিনি বা অভিমত প্রকাশ করিনি। এর পেছনে ভয় যে একটি কারণ- তা এখন স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। পুলিশ ও র‌্যাব ফৌজদারি মামলার 'আসামি' ধরার পর তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তাকে নিয়ে আরও আসামি ধরতে গেলে গভীর রাতে সে পালাতে চেষ্টা করে এবং ওত পেতে থাকা অপরাধীরা গুলি চালালে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ওই ব্যক্তি মারা যায়- এ ধরনের ঘটনার প্রায় অভিন্ন বিবরণ দিয়ে পুলিশ যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়, তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে অনেক আগেই। তবু এই 'ক্রসফায়ার' চলছে তো চলছেই। দেশ-বিদেশে এ ধরনের ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে অভিহিত করা হলেও সরকার তা ক্রমাগত অস্বীকার করে চলে। এই অবস্থায় সিনহা হত্যার ঘটনাকে ক্রসফায়ারের স্বরূপ উদ্ঘাটন বা রাষ্ট্রের শাসন পরিচালনার সংকটের বহিঃপ্রকাশ রূপে ব্যাখ্যা করায় সরকারের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
আরও যে একটি কারণে তখন লিখিনি তা হলো, মামলা। সরকার একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা ছাড়াও ৫ আগস্ট নিহতের বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস মামলা করেন। তদন্ত ও মামলার গতি দেখে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিই।
বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড বা সাধারণ একটি ফৌজদারি ঘটনা মনে না করার কারণেই লেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করি।
ঘটনার দেড় বছরেই মামলাটি সমাপ্ত হলো এবং ৩১ জানুয়ারি রায় দেওয়া হলো। দুই প্রধান আসামি টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলী নামে এক সাবেক পরিদর্শকের (ইন্সপেক্টর) মৃত্যুদণ্ড এবং আরও ছয় পুলিশ সেপাই ও সোর্সের (অপরাধ বিষয়ে সংবাদদাতা) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। চাঞ্চল্যকরই বটে। দেশের ইতিহাসে এই পদমর্যাদার দু'জন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ডের পূর্বনজির সম্ভবত নেই।
বিচারিক আদালতে সিনহা হত্যা মামলার রায়ের ফলে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে; তথাকথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড- সে কথা জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। সরকার এ কথা মানতেই চাচ্ছে না গত অনেক বছর ধরে। ক্রসফায়ার থামানোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইলের দেওয়া রায়ে সিনহার মৃত্যুকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলা হয়েছে। একটি সাধারণ অপরাধ সংঘটনের বিচার হয়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার কার্যক্রমে স্পষ্ট হয়, সিনহা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছেন এবং তিনি যে নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ইয়াবা চোরাচালানের ওপর প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতে টেকনাফে কাজ করছিলেন, তাতে তিনি ওসি প্রদীপের নানা দুস্কর্মের তথ্য পান। ওসি নিজেও সাক্ষাৎকার দিয়ে পরে বুঝতে পারেন যে, বিপদে পড়বেন। সে জন্য তিনি তার পুলিশ সহকর্মীদের যোগসাজশে সিনহাকে হত্যা করেন। প্রদীপের দুস্কর্ম ছিল সরকারের মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযানের বাতাবরণে ক্রসফায়ারে হত্যা, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে এলাকার নিরপরাধ বিত্তবান মানুষদের কাছ থেকে টাকা আদায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই অবিশ্বাস্য তথ্য রয়েছে- ওসি প্রদীপের ৩৩ মাস টেকনাফে দায়িত্ব পালনকালে ১০৬টি 'বন্দুকযুদ্ধে' ১৭৪ ব্যক্তি নিহত হয়।
ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে সরকারের কাছে প্রশংসিত হন প্রদীপ এবং বাংলাদেশ পুলিশ পদক লাভ করেন। পদক দেওয়ার কৃতিবর্ণনা বা সাইটেশনে ছয়টি বন্দুকযুদ্ধের উল্লেখ আছে।
সিনহা হত্যার পরে এই সত্য সামনে এসেছে- মাদক চোরাচালানি সন্দেহে বহু লোককে 'বন্দুকযুদ্ধে' খরচ করা হলেও মাদক ব্যবসা বন্ধ করা যায়নি, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরিত্রনাশের
পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। এটিই শাসনব্যবস্থার একটি সংকট।
সিনহা একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা। তাকে হত্যাকারী পুলিশের লোক। সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন বিবৃতি দিয়ে সামনে আসে। আন্তঃবাহিনী সম্পর্কের ওপর ছায়াপাত ঘটে। এটাও সংকটের আরেক দিক। সেনাপ্রধান ও পুলিশপ্রধান একত্রে টেকনাফে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা, ব্যক্তির দায়; বাহিনীর নয়- দুই বাহিনীর সম্পর্কে চিড় ধরবে না মর্মে বক্তব্য দেন।
মামলাটির দ্রুত তদন্ত শেষে চার্জশিট হয়েছে চার মাসে; বিচার নির্বিঘ্ন হয়েছে; রায় এসেছে দেড় বছরের মাথায়। এ প্রসঙ্গে স্মরণে এসেছে টেকনাফেই ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানে আরেক 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হকের কথা। মৃত্যুর আগমুহূর্তে এক টেলিফোন কথোপকথনে কন্যার 'আব্বু তুমি কান্না করতেছো যে...' আর্তস্বর ভাইরাল হয়ে সমাজের কলিজায় আঘাত করেছিল। বিচার তো দূরের কথা; একরামুলের স্ত্রীর ভাষ্যে মন্ত্রীরা তাকে আশ্বাস দিয়ে মামলা করা থেকে বিরত রেখেছেন।
সিনহা হত্যা মামলাটির রায় এমন সময়ে হলো, যখন 'গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন'-এর অভিযোগ তুলে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাতজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুমুল আলোচনায় এবং এর 'চাপ' সামলাতে সরকার ব্যতিব্যস্ত। এখানেও 'বন্দুকযুদ্ধ' প্রধান আলোচ্য; মার্কিন সরকারের অভিযোগে একরামুল হকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা না হওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে।
এটাও লক্ষণীয়, সিনহা হত্যার পরে 'বন্দুকযুদ্ধ' কমে এসেছিল; আবার শুরু হয়। আর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরে গত তিন মাসে এক দিনও তা হয়নি। আমরা বাস্তবতার মুখোমুখি।
এই ঘটনাগুলোর মূল বার্তা হলো- যত কষ্টই হোক, যত দুরূহই মনে হোক; সরকারকে আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার দিকেই যেতে হবে। 'বন্দুকযুদ্ধ' তথা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। বেআইনি পথে আইন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; বরং রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে যায়।
মোজাম্মেল হোসেন :ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক,  দৈনিক সমকাল

আরও পড়ুন

×