দ্রব্যমূল্য
ভোক্তার স্বার্থ দেখবে কে?
×
আনোয়ার ফারুক তালুকদার
প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২২ | ১২:০০
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপে উঠে এসেছে। দেশে খানাপিছু গড় মাসিক আয় প্রায় ১৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই যায় খাদ্য কেনায়। দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে মাসিক মোট আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে। এই খাদ্যের বেশিরভাগই চাল। দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চালের মাথাপিছু দৈনিক ভোগ ৪৭০ গ্রাম, যেখানে অন্যদের ক্ষেত্রে তা ৩৬৬ গ্রাম। প্রধান খাদ্যশস্যের মূল্যস্টম্ফীতির বোঝাও তাদের ঘাড়ে চাপে বেশি। বিগত দুই বছর কেটেছে মহামারি করোনার সঙ্গে লড়াই করে। করোনার ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন এমনিতেই চরম সংকটে। এ অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায় মানুষের জীবনধারণ দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।
বাজারে জিনিসপত্রের দামের উত্তাপে দিশেহারা দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এবার তাদের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরা ভুগেছেন সমানভাবে। বাজার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চিকিৎসা, বাসস্থান; বস্ত্রের মতো মৌলিক চাহিদাতে ব্যয় কমিয়েছে দেশের জনসংখ্যার বড় একটা অংশ। অনেক ক্রেতার মতে, করোনাভাইরাসের চেয়েও ভয়াবহ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে হয়তো ভাইরাস ঠেকানো সম্ভব; কিন্তু নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে চরম অসহায় তারা। অনেকেই বলছেন, তাদের আয়ের ৯০ শতাংশই খরচ করেছেন বাসা ভাড়া ও বাজারে। আবার অনেকেই তুলনামূলক কম ভাড়ার বাসা নিয়েছেন এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে। প্রতিদিন টিসিবির ট্রাকের পেছনে রাস্তার মোড়ে মোড়ে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য মানুষের লাইন দেখলেই দ্রব্যমূল্য কতখানি প্রকট, তা বোঝা যায়। ধানমন্ডির বিভিন্ন রাস্তার আশপাশে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে অনেক মহিলাকে সাহায্যের আশায় বসে থাকতে দেখা যায়। তাদের অবস্থা ভিক্ষুকের মতো নয়। কাপড়-চোপড় দেখলে মনে হয়, এক সময় তাদের অবস্থা ভালো ছিল। হয়তো করোনা মহামারির কারণে এদের উপার্জনকারী কোনো না কোনোভাবে দুরবস্থায় পতিত হয়েছেন। ফলে সাহায্যের আশায় তারা রাস্তার পাশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এটি তো আমি একটি এলাকার তথ্য দিলাম। এ ছাড়া আরও কত মানুষ যে অসহায় হয়ে বিভিন্ন শহরে কাজের খোঁজে বা সাহায্যের আশায় এসেছেন, তার খবর হয়তো পরিসংখ্যান ব্যুরো দিতে পারবে।
বিবিএসের হিসাবে দেখা যায়, গত জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) দেশে সার্বিক মূল্যস্টম্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা আগের মাস ডিসেম্বরে ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। হিসাব অনুযায়ী, জাতীয়ভাবে ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্টম্ফীতি কমেছে। কিন্তু চাল, আটা-ময়দা, চিনি, ব্রয়লার মুরগি, ডিম, পেঁয়াজ, সবজিসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
দেশে বহুদিন ধরেই লাফিয়ে লাফিয়ে, দফায় দফায় বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে অনেক পণ্যের দাম। প্রতি সপ্তাহের ব্যবধানে নতুন উচ্চতায় পাল্লা দিয়ে দাম বাড়ে নিত্যপণ্যের। সরকারি হিসাবেই মোটা চালের কেজি এখন ৪৮ টাকা। বাজারে তা কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ৫০ টাকা পর্যন্ত। ফলে প্রান্তিক ও সীমিত আয়ের মানুষ একটু ভালোভাবে ডাল-ভাত কিনে খাবে, সে ক্ষেত্রেও তাদের বাদ সাধছে পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি। এতে সাধারণ মানুষ খুব কষ্টের মধ্যে আছেন। বিশেষ করে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা বেশ সঙ্গিন।
প্রান্তিক, শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই এখন চাহিদার তুলনায় কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এতে পুষ্টি সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। কিছু কিছু পণ্যের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে যুক্তি থাকতে পারে; ঠিক তেমনিভাবে কিছু পণ্যের দাম কমার ক্ষেত্রেও যুক্তি আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যেসব পণ্যের ভরা মৌসুমে দাম কমার কথা; অথচ এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর অতিলোভের কারণে দাম কমছে না। সাধারণভাবে ধরে নেওয়া যায়, করোনার প্রকোপ কমে আসায় সবকিছুর চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী। তাই বলে উৎপাদন কম হয়েছে, তা বলা যায় না। দেখা যাচ্ছে, একমাত্র কৃষি খাত করোনার সময় তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেখানে উৎপাদন তেমন ব্যাহত হয়নি। তবে যোগাযোগ বন্ধ বা সীমিত থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বেশ জটিলতা দেখা দিয়েছিল। তাই বলে দেশীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, বাজারে সঠিক তদারকির অভাব এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বৃহত্তর ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে দেশে নিত্যপণ্য উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। অল্প জায়গা এবং কম সময়ে উৎপাদিত হয় এমন পণ্যের জাত বের করতে কৃষি গবেষণায় গুরুত্ব বাড়াতে হবে। আর স্বল্পমেয়াদে আমদানি; পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে বাজার তদারকি বাড়াতে হবে। টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে চাল, আটা, চিনি, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্য প্রান্তিক, শ্রমজীবী ও সীমিত আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানো যেতে পারে।
আনোয়ার ফারুক তালুকদার :অর্থনীতি বিশ্নেষক
বাজারে জিনিসপত্রের দামের উত্তাপে দিশেহারা দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এবার তাদের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরা ভুগেছেন সমানভাবে। বাজার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চিকিৎসা, বাসস্থান; বস্ত্রের মতো মৌলিক চাহিদাতে ব্যয় কমিয়েছে দেশের জনসংখ্যার বড় একটা অংশ। অনেক ক্রেতার মতে, করোনাভাইরাসের চেয়েও ভয়াবহ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে হয়তো ভাইরাস ঠেকানো সম্ভব; কিন্তু নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে চরম অসহায় তারা। অনেকেই বলছেন, তাদের আয়ের ৯০ শতাংশই খরচ করেছেন বাসা ভাড়া ও বাজারে। আবার অনেকেই তুলনামূলক কম ভাড়ার বাসা নিয়েছেন এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে। প্রতিদিন টিসিবির ট্রাকের পেছনে রাস্তার মোড়ে মোড়ে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য মানুষের লাইন দেখলেই দ্রব্যমূল্য কতখানি প্রকট, তা বোঝা যায়। ধানমন্ডির বিভিন্ন রাস্তার আশপাশে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে অনেক মহিলাকে সাহায্যের আশায় বসে থাকতে দেখা যায়। তাদের অবস্থা ভিক্ষুকের মতো নয়। কাপড়-চোপড় দেখলে মনে হয়, এক সময় তাদের অবস্থা ভালো ছিল। হয়তো করোনা মহামারির কারণে এদের উপার্জনকারী কোনো না কোনোভাবে দুরবস্থায় পতিত হয়েছেন। ফলে সাহায্যের আশায় তারা রাস্তার পাশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এটি তো আমি একটি এলাকার তথ্য দিলাম। এ ছাড়া আরও কত মানুষ যে অসহায় হয়ে বিভিন্ন শহরে কাজের খোঁজে বা সাহায্যের আশায় এসেছেন, তার খবর হয়তো পরিসংখ্যান ব্যুরো দিতে পারবে।
বিবিএসের হিসাবে দেখা যায়, গত জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) দেশে সার্বিক মূল্যস্টম্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা আগের মাস ডিসেম্বরে ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। হিসাব অনুযায়ী, জাতীয়ভাবে ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্টম্ফীতি কমেছে। কিন্তু চাল, আটা-ময়দা, চিনি, ব্রয়লার মুরগি, ডিম, পেঁয়াজ, সবজিসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
দেশে বহুদিন ধরেই লাফিয়ে লাফিয়ে, দফায় দফায় বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে অনেক পণ্যের দাম। প্রতি সপ্তাহের ব্যবধানে নতুন উচ্চতায় পাল্লা দিয়ে দাম বাড়ে নিত্যপণ্যের। সরকারি হিসাবেই মোটা চালের কেজি এখন ৪৮ টাকা। বাজারে তা কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ৫০ টাকা পর্যন্ত। ফলে প্রান্তিক ও সীমিত আয়ের মানুষ একটু ভালোভাবে ডাল-ভাত কিনে খাবে, সে ক্ষেত্রেও তাদের বাদ সাধছে পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি। এতে সাধারণ মানুষ খুব কষ্টের মধ্যে আছেন। বিশেষ করে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা বেশ সঙ্গিন।
প্রান্তিক, শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই এখন চাহিদার তুলনায় কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এতে পুষ্টি সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। কিছু কিছু পণ্যের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে যুক্তি থাকতে পারে; ঠিক তেমনিভাবে কিছু পণ্যের দাম কমার ক্ষেত্রেও যুক্তি আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যেসব পণ্যের ভরা মৌসুমে দাম কমার কথা; অথচ এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর অতিলোভের কারণে দাম কমছে না। সাধারণভাবে ধরে নেওয়া যায়, করোনার প্রকোপ কমে আসায় সবকিছুর চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী। তাই বলে উৎপাদন কম হয়েছে, তা বলা যায় না। দেখা যাচ্ছে, একমাত্র কৃষি খাত করোনার সময় তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেখানে উৎপাদন তেমন ব্যাহত হয়নি। তবে যোগাযোগ বন্ধ বা সীমিত থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বেশ জটিলতা দেখা দিয়েছিল। তাই বলে দেশীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, বাজারে সঠিক তদারকির অভাব এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বৃহত্তর ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে দেশে নিত্যপণ্য উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। অল্প জায়গা এবং কম সময়ে উৎপাদিত হয় এমন পণ্যের জাত বের করতে কৃষি গবেষণায় গুরুত্ব বাড়াতে হবে। আর স্বল্পমেয়াদে আমদানি; পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে বাজার তদারকি বাড়াতে হবে। টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে চাল, আটা, চিনি, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্য প্রান্তিক, শ্রমজীবী ও সীমিত আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানো যেতে পারে।
আনোয়ার ফারুক তালুকদার :অর্থনীতি বিশ্নেষক
- বিষয় :
- দ্রব্যমূল্য
- আনোয়ার ফারুক তালুকদার