মাদ্রাসায় অনিয়ম-জালিয়াতি
১০ শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৫০
দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শৃঙ্খলাভঙ্গ, সহকর্মীকে মারধর, বিধিবহির্ভূত নিয়োগ, সরকারি নথি জালিয়াতি এবং ভুয়া শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে এমপিও নেওয়ার অভিযোগে ১০ শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কারও এমপিও স্থগিত, কারও ইনডেক্স কর্তন এবং কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার অধিদপ্তরের জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপন ও কারণ দর্শানোর নোটিশ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের তিন কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগের বিষয়ে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের গোপালনগর মহিলা আলিম মাদ্রাসার ইবতেদায়ী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে সহকর্মী খাইরুল ইসলামকে মারধরের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাঙ্গীর হোসেন খাইরুল ইসলামকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করেছেন। এ ঘটনায় ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬’-এর ১৮.২ (ক) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে অধিদপ্তর।
একই ঘটনায় মাদ্রাসাটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাহ আলমকেও শোকজ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনায় তাঁর যোগসাজশ এবং দায়িত্ব পালনে অদক্ষতা ও অযোগ্যতার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কুমিল্লার দাউদকান্দি মদিনাতুল উলুম ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমীনের বিরুদ্ধেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশ ও সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগে তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
ভোলার চরফ্যাশনের দক্ষিণ চরআইচা রাব্বানিয়া আলিম মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মো. জাকির হোসেনের নিয়োগের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর এমপিও স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধি লঙ্ঘন হয়েছিল কিনা, তা যাচাই করছে অধিদপ্তর।
নীলফামারীর জলঢাকার গোলনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে তাঁর নিয়োগ তৎকালীন এমপিও জনবল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এ কারণে প্রথম এমপিওভুক্তি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি অর্থে নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি এমপিও বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
একই মাদ্রাসার প্রভাষক হোসাইন আহমেদের বিরুদ্ধে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ এবং সরকারি কাগজপত্র জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়ার কথা নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর এমপিও স্থগিতের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ভুয়া শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে এমপিও নেওয়ার অভিযোগে গাজীপুর ও ময়মনসিংহের তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনটিআরসিএর প্রতিবেদনে তাঁদের নিবন্ধন সনদ ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর ইনডেক্স কর্তনের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
গাজীপুরের কাপাসিয়ার বিবাদীয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার ইবতেদায়ী শিক্ষক মো. আফজাল হোসেনের ১৬তম নিবন্ধন এবং একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক লুৎফুন নাহারের ১৩তম নিবন্ধন সনদ নিয়ে আপত্তি রয়েছে। সনদ ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের এমপিও ইনডেক্স কেন কর্তন করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহের ত্রিশালের বীররামপুর জান্নাতুল উলুম আলিম মাদ্রাসার ইবতেদায়ী প্রধান শামিমা নাছরিনের ষষ্ঠ শিক্ষক নিবন্ধন সনদও ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হয়েছে বলে এনটিআরসিএর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ইনডেক্স কেন কর্তন করা হবে না, নোটিশে তা জানতে চেয়েছে অধিদপ্তর।
অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্টদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব পাওয়ার পর তদন্ত প্রতিবেদন ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৬৫৩ মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামের হালনাগাদ তথ্য তলব
এদিকে, দেশের ৬৫৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের জন্য সরবরাহ করা সরঞ্জামের বর্তমান অবস্থা জানতে চেয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। এর আওতায় সিলেট বিভাগ এবং কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রকল্পভুক্ত মাদ্রাসাগুলোর কাছে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খানের সই করা চিঠিতে আগামী ৪ অক্টোবরের মধ্যে নির্ধারিত ছকে তথ্য পাঠাতে বলা হয়।
চিঠিতে প্রকল্পের আওতায় সরবরাহ করা মালামালের বাস্তব অবস্থা জানাতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত ছকে প্রতিষ্ঠানের নাম, ইআইআইএন, জেলা ও উপজেলার তথ্যের পাশাপাশি সরবরাহ করা সরঞ্জামের সংখ্যা এবং সচল বা অচল অবস্থার তথ্য দিতে হবে। প্রয়োজনীয় মন্তব্যও উল্লেখ করতে হবে।
সরঞ্জামের তালিকায় রয়েছে স্মার্ট টিভি, ডেস্কটপ কম্পিউটার, মনিটর, ইউপিএস ও ৪জি ওয়াই-ফাই রাউটার। প্রতিটি মাদ্রাসার সুপার বা অধ্যক্ষকে তথ্য যাচাই করে ছকে স্বাক্ষর ও সিল দিতে বলা হয়েছে।
অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের গত ১৭ সেপ্টেম্বরের স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে।