'তাঁর মৃত্যুর পর মিডিয়ার কেউ একটা ফোন করেও খোঁজ নেয়নি'
এটিএম শামসুজ্জমান ও তাঁর স্ত্রী রুনি জামান
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ০৪:৪২ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ০৪:০৫
গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান। এ বছরের শুরুতে তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে আক্ষেপ নিয়ে এটিএম শামসুজ্জামানের স্ত্রী রুনি জামান বলেছিলেন, মানুষটা মরে গেলো, আর সাথে সাথেই তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলো। কেউ তাকে মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করলেন না। দ্রুত সবাই তাঁকে ভুলে গেলো!’
আজ বরেণ্য এই অভিনেতার জন্মদিন। বেঁচে থাকলে ৮২ বছরে পা রাখতেন তিনি। বিশেষ এই দিনটিতে কেমন আছেন তাঁর পরিবার? পরিবার থেকে কোনো আয়োজনই বা রাখা হয়েছে কিনা? জানতে ফোন করা হয় স্ত্রী রুনি জামানকে।
আক্ষেপ করে তিনি সমকালকে বললেন, 'বিশেষ দিনটিতে আর কি আয়োজন থাকবে। আমি নিজেও তো অসুস্থ। নানাবিধ অসুখে ভোগছি। এখন ভালোয় ভালোই তাঁর (এটিএম শামসুজ্জামানের) কাছে চলে যেতে পারলেই হলো।'

কথায় কথায় রুনি জামান জানালেন, এটিএম শামসুজ্জমান চলে যাওয়ার পর এ পর্যন্ত মিডিয়ার কেউ তাঁদের খোঁজ নেয়নি। পরিবার তো দূরের কথা এটিএম শামসুজ্জামানের কবরটাও কোনোদিন কেউ দেখতে আসেনি। তবে সাধারণ মানুষ এটিএম শামসুজ্জামানকে মনে রেখেছেন। তাদের অনেকেই কবরের পাশে আসেন। পাশ দিয়ে গেলেও কবর জিয়ারত করে যান।
বিষয়টি ভেবে এটিএমের মৃত্যুর প্রথম বছর খারাপ লাগতো রুনি জামানের। এখন আর খারাপ লাগে না। মিডিয়ার মানুষ তো বেঁচে থাকা অবস্থাতেও তেমন খোঁজ নেয়নি। তাই তাদের কাছে প্রত্যাশা করাটাও বোকামিই মনে করেন তিনি।
রুনি বলেন, 'মিডিয়ার মানুষ সামনা সামনি অনেক কিছু বলে। কিন্তু আড়ালে গেলে তারা সব ভুলে যায়। এখন আর তাদের কাছ থেকে একটা ফোন কলও আশা করি না। যখন এটিএম শামসুজ্জমান অসুস্থ হয়ে বেঁচে ছিলেন তখনও কেউ যোগাযোগ করতো না বলে আক্ষেপ করতেন। এখন মৃত্যুর পর আমার আক্ষেপ করার আর কিছু নেই।'

জন্মদিন উপলক্ষে এফডিসি বা শিল্পীদের কেউ ফোন করেছিলো কি? উত্তরে বলেন, 'না, কেউ ফোন করেনি।'
হতাশা ও আক্ষেপ নিয়ে তিনি আরও বলেন, শুধু জন্মদিন কেনো কোনো দিনই মিডিয়ার কেউ ফোন করেন না। তারা এটিএমকে ভুলে গেছে। এখন তাদের মনে রাখাতেও কিছু যায় আসে না।'
রুনি জামান বলেন, 'নাটক, সিনেমার জন্য সারাটা জীবন দিয়ে গেলেন। নিজের স্বার্থে কিচ্ছু চিন্তা করেননি, নাটক সিনেমাকে সব দিয়ে গেলেন। অথচ তার মৃত্যুর পর কেউ সামান্য খোঁজ খবরটাও নিলেন না। অন্তত নাটক সিনেমার মানুষরাতো তার পরিবারের খোঁজ খবর নিতে পারতেন! হয়তো এটাই বাস্তবতা।”
শামসুজ্জামানের চলচ্চিত্র জীবন শুরু হয় কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। জলছবি, যাদুর বাঁশি, রামের সুমতি, ম্যাডাম ফুলি, চুড়িওয়ালা, মন বসে না পড়ার টেবিলে চলচ্চিত্রে তাকে কৌতুক চরিত্রে দেখা যায়। তার অভিনয় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় আমজাদ হোসেনের 'নয়নমণি' চলচ্চিত্রটি। এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন।
তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনের শুরু ১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর 'বিষকন্যা' চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে। প্রথম কাহিনী ও চিত্রনাট্য লিখেছেন 'জলছবি' চলচ্চিত্রের জন্য। ছবির পরিচালক ছিলেন নারায়ণ ঘোষ মিতা, এ ছবির মাধ্যমেই অভিনেতা ফারুকের চলচ্চিত্রে অভিষেক। এ পর্যন্ত শতাধিক চিত্রনাট্য ও কাহিনী লিখেছেন।

অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্র পর্দায় আগমন ১৯৬৫ সালের দিকে। ১৯৭৬ সালে চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের নয়নমণি চলচ্চিত্রে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি। ১৯৮৭ সালে কাজী হায়াত পরিচালিত ‘দায়ী কে?’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। তিনি রেদওয়ান রনি পরিচালিত 'চোরাবালিতে' অভিনয় করেন ও শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-চরিত্রে অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
অভিনয়ের জন্য আজীবন সম্মাননাসহ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ছয় বার, তার মধ্যে দায়ী কে? (১৯৮৭) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে; ম্যাডাম ফুলি (১৯৯৯), চুড়িওয়ালা (২০০১) ও মন বসে না পড়ার টেবিলে (২০০৯) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা বিভাগে এবং চোরাবালি (২০১২) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে পুরস্কৃত হন।
এছাড়া, ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সময় তিনি আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন।
- বিষয় :
- এটিএম শামসুজ্জামান
- রুনি জামান
- জন্মদিন
