প্রচ্ছদ
ফারিণ হয়ে উঠার গল্প
তাসনিয়া ফারিণ, ছবি ::নাজমুল হোসাইন হিমেল
সমু সাহা
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২০ | ০২:৫৮ | আপডেট: ১২ মার্চ ২০২০ | ০৩:০৮
ক্যারিয়ারের খুব বেশি সময় পাড়ি দেননি। এরই মধ্যে টিভি পর্দার প্রিয় মুখ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ। ফ্রেমের দুনিয়াকে আপন করে নেওয়ার পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল না তার। মুখে লেগে থাকা এক চিলতে হাসির সঙ্গে রূপলাবণ্যের দ্যুতি ছড়িয়ে তিনি হয়েছেন দর্শকের প্রিয় একজন।
অনেকের সকালের শুরুটা হয় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে। সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত যেন সকালের শুভ্রতাকে আরও বেশি করে অঙ্গে মেখে দেয়। কিন্তু অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণের বেলায় সে ভাগ্য আর জুটল কই? অবশ্য ভাগ্যকে দোষ দেওয়াটা আবার একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। আজ তিনি যে সাধারণ দর্শকের এত কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছেন, সে ভাগ্যই বা ক'জনের জোটে। এখন ফারিণের সকালের শুরুটা হয় গাড়িতে বসে কোনো নাটকের শুটিংয়ে যাত্রার মধ্য দিয়ে। এফএম-এ বেজে ওঠে হাবিবের গাওয়া 'স্বপ্নে তার সাথে হয় দেখা/ বসে বসে ভাবি, তা একা একা/ সে যে স্বপ্নে আসে তবু/ স্বপ্নের চেয়েও মধুর/ তাকে পাবার আশায়/ দু'চোখ রাখা দূর বহুদূর' গানটি। পরক্ষণেই আনমনে তিনি ভাবেন, সত্যিই কী যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা ধরতে পেরেছেন?

যদিও ফারিণের অভিনেত্রী হিসেবে যে তকমা জুটেছে তার জন্য কোনো স্বপ্ন দেখেননি তিনি। তাহলে ফারিণ কিসের স্বপ্ন দেখছেন? পাঠককে এত রহস্যের দোলাচলে না রেখে ফারিণ নিজেই খোলাসা করলেন বিষয়টি। বলেন, 'আমার মায়ের দেখা স্বপ্নের পেছনে এখন ছুটছি। মায়ের ইচ্ছা ছিল অভিনয় করার। কিন্তু পরিবার থেকে সাপোর্ট না পাওয়ায় মা অভিনয়ে আসতে পারেননি। তবে মায়ের প্রত্যাশা ছিল আমি যেন অভিনয় করতে পারি। মায়ের ইচ্ছা থেকেই অভিনয় জগতে প্রবেশ করি। তার ইচ্ছা না থাকলে হয়তো আজ ফারিণ হতে পারতাম না। মায়ের স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটাতে চাই আমি।'
বাবা সরকারি কর্মকর্তা, মা গৃহিণী। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালে পড়ছেন ফারিণ। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি বড়। পরিবারের বড় মেয়েটি এখন মায়ের জন্য বড় স্বপ্নের পেছনে ছুটছেন। একজন সুঅভিনেত্রী হিসেবে দর্শক মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেওয়ার জন্যই তার এই স্বপ্নযাত্রা। তার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল সাফায়েত মনসুর রানা পরিচালিত 'আমরা ফিরব কবে' নাটকের মাধ্যমে। নাটকটি ২০১৭ সালে প্রচার হয়। এর আগে ২০১৬ সাল থেকে বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। তবে ফারিণের অভিনয় জীবনের মোড় ঘুরেছিল গত বছর ইউটিউবের জন্য নির্মিত একটি নাটক দিয়ে। এর নাম 'এক্স বয়ফ্রেন্ড'। কাজল আরেফিন এটি নির্মাণ করেছিলেন। একই সময়ে ইমরাউল রাফাতের 'ফার্স্ট ইয়ার ডোন্ট কেয়ার-২' নাটকটিও ইউটিউবে প্রকাশ পাওয়ায় ফারিণের বৃহস্পতি রীতিমতো তুঙ্গে উঠে যায়। তিনি বলেন, 'ওই নাটক দুটি প্রচারের পর রাতারাতি যেন সব বদলে যেতে শুরু করে। মানুষ আমাকে একটু একটু করে চেনা শুরু করে।

তখন থেকেই পরিচালকরা আমাকে নিয়ে কাজের আগ্রহ দেখাতে লাগলেন। ব্যাচেলর ট্রিপ নাটকে অভিনয় করেও এমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম আমি।' এরপর আর পেছনে ফিরে দেখার সময় হয়নি ফারিণের। একে একে আমি গাধা বলছি, উগান্ডা মাসুদ-২, পুলিশ, আগুনের দিন শেষ হবে একদিন, নোটবুট নাটকে অভিনয় করে এই অভিনেত্রী নিজেকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এত দ্রুত দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার জন্য ভাগ্যের সহায়তার কথাই বলেছেন মিষ্টি হাসির মেয়েটি। বলেন, 'সত্যি আমি সৌভাগ্যবান। খুব কম সময়ে আমার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। ভালো অভিনয় করতে পারি, সে দাবি করছি না। যতটুকু কাজ করি ততটুকুই গুরুত্ব দিয়ে করার চেষ্টা করি। চরিত্র বুঝে অভিনয় করার চেষ্টা করি। এই চেষ্টাই হয়তো নির্মাতাদের ভালো লেগেছে।' ফারিণ প্রতিনিয়ত অভিনয়ের প্রস্তাব পান। চলতি বছর অভিনয়ের প্রস্তাব আরও বেশি পাচ্ছেন। তবে প্রস্তাবের তুলনায় কাজের সংখ্যা কম। বেছে বেছে কাজ করেন বলেই ভিন্ন গল্পের বৈচিত্র্যময় চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরতে পারেন তিনি।
কিন্তু ধারাবাহিকে এ অভিনেত্রীকে এখনও দেখা যায়নি। এর পেছনের কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, 'ক্যারিয়ারের শুরু থেকে ধারাবাহিকবিমুখ ছিলাম। এখনও সেই অবস্থানে রয়েছি। খুব দুর্বল গল্প নিয়ে বেশিরভাগ ধারাবাহিক নির্মিত হচ্ছে। এখনকার ধারাবাহিকে কাজ করতে মন সায় দেয় না। তাই ধারাবাহিকে অভিনয় করছি না।' ধারাবাহিকে না হয় এ অভিনেত্রীর অনিচ্ছার কথা জানা গেল। কিন্তু তার অনেক অগ্রজ ছোট পর্দার সিঁড়ি বেয়ে সিনেমায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। ফারিণ নিজেও সে সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে বলেন, 'বড় পর্দায় অভিনয়ের ইচ্ছা সব অভিনয়শিল্পীরই থাকে। আমারও রয়েছে। এরই মধ্যে অনেক প্রস্তাব এসেছে। যে ছবিগুলোর প্রস্তাব এসেছে, তার গল্প দেখে জুতসই মনে হয়নি। তবে সিনেমার জন্য নিজেকে এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত মনে করছি না। যখন অভিনয় করব, তখন অবশ্যই ভালো গল্প, চরিত্র দেখে কাজ করতে চাই। সে অপেক্ষায় আছি।'

আগামীতে ফারিণ সিনেমায় অভিনয় করবেন কিনা তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে অবসর সময়ে সিনেমা দেখতে ভীষণ ভালোবাসেন এ অভিনেত্রী। সর্বশেষ অস্কারজয়ী সিনেমা 'প্যারাসইট'-এর ঘোর এখনও কাটাতে পারেননি তিনি। এ ছাড়া ছোটবেলা থেকেই লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর অভিনয়ের ভক্ত ফারিণ। অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপের অভিনয়ের গুণমুগ্ধ ভক্তও তিনি। আর দেশের মধ্যে সুর্বণা মুস্তাফা, আসাদুজ্জামান নূর, তারিক আনাম খান, জয়া আহসানের অভিনয় তাকে আলাদা করে টানে।
অভিনয় ক্যারিয়ারে বেশি সময় পার না করলেও এখন পর্যন্ত অসংখ্য তারকার সঙ্গেই পর্দায় দেখা গেছে ফারিণকে। তবে মাহফুজ আহমেদের সঙ্গে এখনও স্ট্ক্রিন শেয়ার করা হয়নি তার। হয়তো আগামীতে সে ইচ্ছা পূরণ হবে- এমনটাই প্রত্যাশা অভিনেত্রীর। তারকাদের কর্মজীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন সর্ম্পকে জানতেও উন্মুখ হয়ে থাকেন ভক্তরা। প্রেম ও বিয়ে নিয়ে ভক্তদের প্রশ্নের বাণ ফারিণের দিকে ছুড়ে দিলেও প্রশ্নবাণটি যেন তার পাশ ঘেঁষেই চলে গেল। বলেন, 'এসব বিষয় একদমই মাথায় নেই। সৃষ্টিকর্তা যা কপালে লিখে রেখেছেন, তাই হবে। এখন ভাবনাজুড়ে অভিনয়। তাই অভিনয়ই আমার ধ্যানজ্ঞান। পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছি।'
খুব অল্প সময়েই তারকাখ্যাতি অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়-ফারিণ বিষয়টি ভালো করেই জানেন বলে ধীরস্থির হয়ে সামনের পথ এগোতে চাইছেন। কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মধ্যে তাই নিজেকে বেঁধে রাখতে চান না। তিনি হয়তো রবিঠাকুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলতে চাইছেন, 'অদৃষ্টের হাতে লেখা সূক্ষ্ণ এক রেখা/ সেই পথ বয়ে সবে হয় অগ্রসর..। হাতের রেখাটি যে ফারিণের সাফল্যরেখা তাতে হয়তো এ অভিনেত্রী দ্বিমত পোষণ করবেন না।
- বিষয় :
- তাসনিয়া ফারিণ
- বিনোদন
