স্টিল সিঙ্গেল
রান্নাঘরের বাইরে নিঃসঙ্গ এক শিল্পীর প্রতিচ্ছবি
ছবি: সমকাল
অনিন্দ্য মামুন, টরন্টো (কানাডা) থেকে
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:০০ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:১০
টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অষ্টম দিনে বিশ্বপ্রিমিয়ার হল জামাল বার্গার ও জুকান টাটেইসির ডকুমেন্টারি ‘স্টিল সিঙ্গেল’। নাম শুনে মনে হতে পারে এটি নিছক খাবার বিষয়ক ছবি। কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিচালকরা প্রমাণ করেন, এটা শুধু রান্নাঘর বা রেস্টুরেন্টের গল্প নয়, এ এক মানুষকে উন্মোচনের প্রয়াস। মানুষটির নাম মাসাকি সাইতো। যিনি কানাডার একমাত্র তারকা শেফ।
৯৩ মিনিটের ডকু-সিনেমাটি শুরু হয় সমুদ্রসৈকতে এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দিয়ে। ঢেউয়ের শব্দের মাঝে সাইতো নিজের হাতে সুশি বানাচ্ছেন, এ যেন প্রকৃতির বুকে তার শিল্পের জন্মদৃশ্য। এখানেই তিনি জানিয়ে দেন, রান্নাঘরই তার মঞ্চ, সুশি তৈরিই তার পারফরম্যান্স।
মাসাকি সাইতোর জন্ম হোক্কাইডোতে। তিনি শৈশবেই বুঝেছিলেন, খাবার মানুষের হৃদয়ে কত গভীর স্মৃতি তৈরি করতে পারে। সেই উপলব্ধিই তাকে এনেছে আজকের উচ্চতায়।
শব্দহীন রেস্টুরেন্টে প্রতিটি মাছের টুকরো, চালের দানা, এমনকি পরিবেশনের তাপমাত্রা পর্যন্ত মাসাকি সাইতোর নজরে। তিনি বিশ্বাস করেন, গ্রাহকের ৯৯ শতাংশ সন্তুষ্টি ব্যর্থতা; তার লক্ষ্য সবসময় শতভাগ দেওয়া। এই কঠোর মানদণ্ড কর্মীদের মাঝে ভয়ের সঞ্চার করলেও, সাইতো নিজেকে ছাড় দিতে জানেন না। তার স্বপ্ন, এমন একটি দল গড়া যারা কোনো নির্দেশনা ছাড়াই নিখুঁত কাজ করতে পারবে, যা তাকে পৌঁছে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত তৃতীয় তারকার পথে।

‘স্টিল সিঙ্গেল’ এর আসল সুর বাজে রান্নাঘরের বাইরে। ২০২২ সালের মিশেলিন স্টার অনুষ্ঠানে তিনি মজা করে বলেছিলেন, “আই অ্যাম স্টিল সিঙ্গেল, আই ডোন’ নো হোয়াই।” সিনেমাটি সেই একলাইনের গভীরে আলো ফেলেছে। ক্যামেরা ধরা দেয় এক জটিল মানুষ ও কড়া শাসকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একাকী আত্মাকে।
বন্ধুত্ব হারানো, পরিবারের প্রতি নিরাসক্তি কিংবা সম্পর্কের প্রতি বিরক্তি- সব মিলিয়ে সাইতো এক অদ্ভুত দ্বৈততায় দাঁড়িয়ে আছেন। একদিকে তিনি পারফেকশনের যাদুকর, যার সুশি খেতে মানুষ লাইনে দাঁড়ায়; অন্যদিকে তিনি এক অনন্ত নিঃসঙ্গতার ভেতর ডুবে থাকা মানুষ, যিনি হয়তো নিজেও বোঝেন না তিনি আসলে কী খুঁজছেন।
শেষ পর্যন্ত ‘স্টিল সিঙ্গেল’ দর্শককে বিষণ্নও করে তোলে। সুশির স্বাদ, নিখুঁততার সাধনা আর একাকীত্বের তীব্রতা মিলেমিশে যে আবহ তৈরি হয়, তা সহজে ভোলার নয়। এই ডকুমেন্টারি কেবল একজন শেফকে নয়, এক নিঃসঙ্গ শিল্পীকে অমর করে রাখে পর্দায়।