ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তারকাদের প্রার্থণায় ইলিয়াস কাঞ্চন, চিকিৎসার অগ্রগতি জানা যাবে ডিসেম্বরে

তারকাদের প্রার্থণায় ইলিয়াস কাঞ্চন, চিকিৎসার অগ্রগতি জানা যাবে ডিসেম্বরে
×

স্ত্রীর সঙ্গে নিজের ছবির দিকে তাকিয়ে নস্টালজিক ইলিয়াস কাঞ্চন। ছবি: অভিনেতার থেকে পাওয়া।

বিনোদন প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:০৪ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:০৭

ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবন শুরু থেকেই সংগ্রামের গল্পে ভরা। ছোট শহরের স্বপ্নবাজ এক তরুণ থেকে ধাপে ধাপে তিনি উঠে এসেছেন ঢালিউডের নন্দিত নায়কের আসনে। একসময় শুটিং ফ্লোরে ঘুরে বেড়ানো যে যুবক মাত্র কয়েকটি সংলাপ বলার সুযোগের অপেক্ষায় দিন কাটিয়েছেন, তাঁকেই পরে দর্শক পেয়েছেন বেদের মেয়ে জোসনার মতো জনমানুষের সিনেমার নায়ক হিসেবে। তাঁর অভিনয়ের ধরনে ছিল বিনয়, পরিশ্রম আর বাস্তবতার ছোঁয়া। ক্যামেরার সামনে যেমন সরল ও নিখাদ একজন শিল্পী, ঠিক তেমনই পর্দার বাইরে ছিলেন সময়ের বেদনা ও দায়বদ্ধতায় জাগ্রত এক মানুষ। সেই প্রিয়মুখ আজ কঠিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছেন।  তিনি এখন লন্ডনে অবস্থান করছেন মেয়ে ও জামাতা আরিফুল ইসলামের বাসায়।

তাঁর শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ তথ্য জানিয়ে আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আব্বুর শারীরিক অবস্থা এখনও অপরিবর্তিত। সপ্তাহে পাঁচ দিন করে তাঁকে নিতে হচ্ছে রেডিওথেরাপি, যা টার্গেট থেরাপি হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। ছয় সপ্তাহ শেষ হলে চার সপ্তাহ তাঁকে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি।’ তিনি কথা বলতে পারেন কিনা–এমন প্রশ্নের উত্তরে জানান, ‘পুরোপুরি কথা বলেন না। তবে যদি কেউ খুব প্রয়োজনীয় কিছু বলেন, তিনি অল্প করে সাড়া দেন। যেমন পানি চাইলে শব্দ করে বলেন দাও। আসলে আগের সার্জারির পর থেকেই কথা বলা কমিয়ে দিয়েছেন তিনি। কথা বলতে গেলে তাঁর কষ্ট হয়।’ পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চিকিৎসকদের মতে সুস্থ হতে সময় লাগবে এবং ধৈর্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। আরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আব্বু এ বছরের এপ্রিলে লন্ডনে এসেছেন। আমরা এয়ারপোর্ট থেকে নিতে গেলে দেখেছি, তিনি খুব ক্লান্ত ছিলেন এবং দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। এরপর ধীরে ধীরে চিকিৎসা শুরু হয়।’

লন্ডনে ইলিয়াস কাঞ্চনকে দেখতে যান অভিনেত্রী রোজিনা। ছবি: অভিনেত্রীর থেকে পাওয়া।

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ইলিয়াস কাঞ্চনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁর ছেলে মিরাজুল মইন জয়। গত শুক্রবার তিনি এক বার্তায় বলেন, ‘আমার বাবা এখনও চিকিৎসাধীন। নিয়মিত চিকিৎসা চলছে। কেউ গুজবে কান দেবেন না। দেশবাসীসহ সবার কাছে অনুরোধ করছি, আপনারা বাবার সুস্থতার জন্য দোয়া করবেন।’

তিনি আরও জানান, বাবার অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের কর্মী, ভক্ত এবং সাধারণ মানুষ দেশ-বিদেশ থেকে দোয়া করছেন। বিশেষ করে গত শুক্রবার জুমার নামাজে বহু স্থানে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল হয়েছে, যা তাদের পরিবার আন্তরিক কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেছে।

জয় অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ইউটিউবার ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী ভিউ বাড়ানোর আশায় বিভ্রান্তিকর ভিডিও বানাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে ভক্তদের মনে কষ্ট দিচ্ছে এবং পরিবারকে বিব্রত করছে। তিনি বলেন, ‘যদি কারও সত্যতা জানার প্রয়োজন হয়, তারা নিরাপদ সড়ক চাই কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান লিটন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। অযথা গুজবে বিভ্রান্ত হবেন না।’

ইলিয়াস কাঞ্চনের অসুস্থতার খবরে সহশিল্পীরাও উদ্বিগ্ন। চলচ্চিত্র অঙ্গনের শিল্পী, সংগঠন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা ফোন, বার্তা কিংবা সামাজিক মাধ্যমে তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছেন। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকেও দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

ইলিয়াস কাঞ্চনের সুস্থতা কামনা করে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর বলেন, ‘ইলিয়াস কাঞ্চন শুধু আমাদের চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র নন, তিনি সচেতন নাগরিক, সমাজসেবক এবং সবার অনুপ্রেরণার এক অনন্য নাম। তাঁর অসুস্থতার খবর জেনে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। দোয়া করেছি, আল্লাহ যেন তাঁকে দ্রুত সুস্থ করে তোলেন। তিনি সুস্থ স্বাভাবিকভাবে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন এবং কাজেও ফিরবেন বলে আমরা আশাবাদী।’ 

বরেণ্য অভিনেতা সোহেল রানা বলেন, ‘ইলিয়াস কাঞ্চন চলচ্চিত্রের আপন একজন মানুষ। চলচ্চিত্রকর্মীদের সুখেদুঃখে পাশে থাকতেন তিনি। এমন একজন মানুষের হঠাৎ অসুস্থতার খবর শুনে খারাপ লাগছে। তাঁর সুস্থতা কামনা করছি।’ 

নব্বই দশকের সাড়াজাগানো নায়ক নাঈম বলেন, সেই ছোটবেলায় ‘নালিশ’ সিনেমার শুটিং দেখার সময় ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। একসময় আমিও চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করি এবং তখনই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। পরিচয়ের শুরু থেকেই বোঝা যায়, তিনি একজন ভালো মানুষ। সহজ সরল ও নীতিবান। হঠাৎ তাঁর অসুস্থতার খবর শুনে কষ্ট পেয়েছি, খুব খারাপ লেগেছে। একটাই চাওয়া–তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন। 

ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছেন নায়ক আমিন খান। তিনি বলেন, খবরটি শোনার পর প্রচণ্ড খারাপ লেগেছে। ইলিয়াস কাঞ্চন ভাই আমাদের চলচ্চিত্রের একজন অভিভাবক। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি একজন ভালো মানুষ। ঢাকাই সিনেমা ও সমাজের রত্নও ইলিয়াস কাঞ্চন ভাই। তাঁর সঙ্গে আমার শত শত স্মৃতি রয়েছে। সবসময় মনে হয়েছে, তিনি একজন বড় ভাই। তাঁর অসুস্থতার খবর আমাকে সত্যিই কষ্ট দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রিয় মানুষটির জন্য দোয়া চাইছি। 

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২১-এ ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন গুনী অভিনয়শিল্পী ডলি জহুর। তিনি বলেন, ‘ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে একসঙ্গে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পেয়েছি। তাঁর অর্জনে আমি বেশ খুশি হয়েছিলাম। সবার প্রিয় মানুষটির অসুস্থতার খবরে খারাপ লাগছে। তিনি যেন সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসতে পারেন সৃষ্টিকর্তার কাছে এ দোয়াই চাইছি। 

প্রসঙ্গত, দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে শতাধিক জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দিয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তাঁর অভিনীত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। ‘ভেজা চোখ’ সিনেমায় তাঁর অভিনয়ে কেঁদেছে অগণিত দর্শক। শুধু পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন আজ জাতীয় স্লোগানে রূপ নিয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদকসহ বহু সম্মাননা পেয়েছেন।

আরও পড়ুন

×