ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাত ২টা ১৭ মিনিটে ১৭ শিশু নিখোঁজ, এরপর?

সিনেমা রিভিউ: ওয়েপনস

রাত ২টা ১৭ মিনিটে ১৭ শিশু নিখোঁজ, এরপর?
×

এক রাতে ১৭ শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে ‘ওয়েপনস’ সিনেমার গল্প। ইলাস্ট্রেশন: সংগৃহীত

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৭:০৯

রক্ত ঠাণ্ডা করা রহস্যে ভরা এই সিনেমা কি দেখতেই হবে? যদি মনে করেন, ভয়ংকর দানব কিংবা ভারী অস্ত্রের ঝনঝনানির চেয়ে মানুষের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড আরও বেশি ভীতিকর- তাহলে চলতি বছর মুক্তি পাওয়া ‘ওয়েপনস’ নামের সিনেমাটি আপনার জন্য।

চলতি বছরের সেরা ১৬ সিনেমার একটি তালিকা তৈরি করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। এতে ১ নম্বরে আছে ‘ওয়েপনস’। এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক রহস্যের গল্প, যা এক মুহূর্তের জন্যেও আপনাকে আরাম দেবে না। বিবিসির মতে, ২ ঘণ্টা ৮ মিনিটের সিনেমাটি ভৌতিক চলচ্চিত্রের একেবারে নতুন ধাঁচের জন্ম দিয়েছে।

মূল রহস্যটা শুরু হয় এক ভয়ংকর রাতে। যুক্তরাষ্ট্রের এক শান্ত শহরে (কল্পিত) স্কুলপড়ুয়া ১৭ শিশু নিখোঁজ হয়। ছোটবেলায় উড়োজাহাজের ডানার মতো দুই হাত মেলে দৌঁড়াতেন নিশ্চয়? এই শিশুরাও ঠিক সেভাবেই রাত ২টা ১৭ মিনিটে প্রত্যেকের বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর দৌঁড়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো একের পর এক ঘর থেকে বের হওয়া শিশুরা যায় কোথায়? ছবি: সংগৃহীত

পরের দিনটি ছিল বুধবার। মেব্রুক নামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাস্টিন গ্যান্ডি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে মাত্র এক ছাত্রকে দেখতে পান। তখনই সামনে আসে আগের রাতে ১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর। 

ছোট শহরের এমন ঘটনা বড় খবর হয়ে ওঠে। বিদ্যালয়ে গিয়ে অভিভাবকরা বৈঠক করেন। কথা একজন থেকে আরেকজন হয়ে শেষমেশ সন্দেহের তীর যায় জাস্টিনের দিকে। পুলিশও তদন্তে নামলো, কিন্তু কোনো সূত্র খুঁজে পেল না। প্রশ্ন ওঠে, হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো একের পর এক ঘর থেকে বের হওয়া শিশুরা দৌঁড়ে গেল কোথায়?

প্রচলিত রহস্য ও ভৌতিক সিনেমা থেকে ‘ওয়েপনস’ এখানেই ব্যতিক্রম। শিশুদের নিখোঁজের পেছনে কে দায়ী- শুধু এমন প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার আরও বড় সামাজিক সমস্যাজনিত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। 

সে চেষ্টার প্রথমেই আসে সামাজিক ট্রমা। সিনেমায় দেখতে পাই, জটিল ও বিরূপ পরিবেশে প্রথমে সমাজের মানুষে-মানুষে অবিশ্বাস দানা বাঁধে। যা এক সময় প্রভাবিত করে দৈনন্দিন জীবনকে। 

২০২২ সালে ‘বারবারিয়ান’ বানানো জ্যাক ক্রেগার ওয়েপনস-এ ভয়ের নতুন সংজ্ঞা নিয়ে কাজ করেছেন। ভয় দেখানোর জন্য তিনি চিরাচরিত ভূত বা দানব ব্যবহার করেননি। বরং হাতিয়ার বানিয়েছেন মানুষের অবিশ্বাসকে। কথা বলার ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় একে-অপরের প্রতি তাকানোর ভঙ্গি দেখেও বিশ্বাস-অবিশ্বাস বিচার করি। জ্যাক ক্রেগার ক্যামেরা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঠিক এই মনোভাবকেই কাজে লাগিয়েছেন। কখনো দূর থেকে কোনো নির্জন বাড়ি দেখিয়েছেন, আবার কখনো স্কুলবাসের নিচে ক্যামেরা রেখে অচেনা ব্যক্তির হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য ধারণ করেছেন। 

ওয়েপনস সিনেমার একটি দৃশ্যে জুলিয়া গার্নার। ছবি: সংগৃহীত

গল্প কথনেও ব্যবহার হয়েছে ‘রশোমন ইফেক্ট’। অর্থ্যাৎ, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ দেয়। কিন্তু কার বর্ণনা বিশ্বাস করবেন, দর্শক হিসেবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যা সিনেমার সাসপেন্স চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। 

কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকা জুলিয়া গার্নারের (জাস্টিন) আগের কোনো সিনেমা দেখা হয়নি। তাঁর অভিনীত ‘ওজার্ক’ নামের টিভি সিরিজটিও দীর্ঘদিন ধরে ‘মাই লিস্টে’। ফলে ‘ওয়েপনস’ সিনেমায় অভিনয়ের চেয়ে ক্যামেরা আর আবহ সংগীতই আমার কাছে বেশি উত্তেজনাকর মনে হয়েছে। পুরো সময় জুড়ে ফিসফিস করে ভয় দেখিয়েছে। এমন দুর্দান্ত আবহ সংগীতের ব্যবহার সবশেষ দেখেছি, দ্য কন্টিনেন্টাল (২০২৩) নামের টিভি সিরিজে।   

এখন প্রশ্ন তুলতে পারেন সিনেমাটির গল্প ও নির্মাণ কি এতটাই নিখুঁত? উত্তর- ‘একদমই না’। তাহলে কি খারাপ? এ প্রশ্নের উত্তর হলো- ‘কখনোই না’।

সিনেমার গল্প বলার ধরন একদম হাড়ে কাঁপন ধরানোর মতো। শুরু থেকেই একটা শীতল পরিবেশে অশুভ কিছু ঘটার অনুভূতিতে ঘিরে রাখে। হরর ধাঁচের সিনেমায় দর্শককে কেবল বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে পরিচালক কিছুটা ঝুঁকি নিয়েছেন। আবার গতানুগতিক ছক ভাঙায় সফলও হয়েছেন।

সিনেমায় একটি রহস্যময় চরিত্রে অ্যামি ম্যাডিগান। ছবি: সংগৃহীত

হোঁচট খাওয়ার মতো ব্যাপারও আছে। রহস্য-রোমাঞ্চের সিনেমা দেখতে বসে যারা প্রতি পাঁচ মিনিটে একটা চমক আশা করেন, তারা ধীরগতির কারণে একটু বিরক্ত হতে পারেন। একাধিক চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরায় মূল রহস্য খানিকটা অস্পষ্টও মনে হতে পারে। এখানে আসলে পরিচালক দর্শকের মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। তিনি রহস্য জাগানো কিছু প্রশ্নের উত্তর দর্শকদের কল্পনার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

এক রাতে একই শ্রেণিতে পড়ুয়া ১৭ শিশু নিখোঁজ হলো। কেবল একজন বাদে। এই রিভিউয়ে অ্যালেক্স নামের সেই শিশু সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না বলেই লেখাটা শেষ করলে কেমন হয়?

একনজরে ‘ওয়েপনস’

ধরন: ভৌতিক/রহস্য

আইএমডিবি রেটিং: ৭/১০

পরিচালক: জ্যাক ক্রেগার

অভিনয়: জুলিয়া গার্নার, অ্যামি ম্যাডিগান, ক্যারি ক্রিস্টোফার

প্ল্যাটফর্ম: এইচবিও ম্যাক্স

আরও পড়ুন

×