আমাদের সিনেমা রটারড্যামে...
পরিচালক তাউকীর, সুমন ও সুমিত। কোলাজ: সমকাল
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৯:২২ | আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৯:২৬
ইউরোপের শীতল শহর রটারড্যাম– জানুয়ারির শেষ প্রান্তে যেখানে বাতাসে বরফের গন্ধ, আলো-ছায়ার ভেতর দিয়ে হাঁটে বিশ্বের নানা দেশের গল্প। সেই শহরেই এবার যেন একটু ঢাকার হাওয়া বইছে। বাংলাদেশের নদীর ঘ্রাণ, রাজনীতির টানাপোড়েন আর সম্পর্কের নানা সংকটের চিত্র ফুটে উঠছে সেখানে। বাংলাদেশের তিন সিনেমা একসঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে নেদারল্যান্ডে রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। ‘রইদ’, ‘মাস্টার’ ও ‘দেলুপি’– বাংলাদেশের তিনটি আলাদা আলাদা এই উৎসবের অলিগলি চষে বেড়াচ্ছে।
২৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই উৎসব চলবে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ইতিহাসের পাতায় এটি বিশেষ হয়ে থাকছে বাংলাদেশের জন্য। কারণ এই প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উৎসবে একসঙ্গে তিনটি দেশি সিনেমা নির্বাচিত হয়েছে তিনটি ভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে। আর এই তিন সিনেমা নিয়েই তিনটি টিম উড়াল দিয়েছে নেদারল্যান্ডে। সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক ছবি দিয়ে নিজেদের অনূভূতিগুলোও ভাগ করে নিচ্ছেন দেশবাসীর সঙ্গে।
ব্রাইট ফিউচার শাখায় দেলুপি:
রটারড্যামের ব্রাইট ফিউচার বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম পরিচালিত ‘দেলুপি’। খুলনার মাটির গন্ধ, নদীভাঙনের ক্ষত, জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ আর মানুষের নিরন্তর লড়াই– সব মিলিয়ে এক বাস্তবধর্মী ক্যানভাস। সিনেমাটি নিয়ে গত ২৭ জানুয়ারি নির্মাতা ও টিম রটারড্যামে পৌঁছেছেন। ৩১ জানুয়ারি উৎসবে সিনেমাটির প্রথম প্রদর্শনী হয়। দ্বিতীয় শো প্রদর্শিত হয় গতকাল। এরপর ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি আরও দুটি শো রয়েছে। চিরঞ্জিৎ বিশ্বাস, অদিতি রায়, রুদ্র রায়, জাকির হোসেনদের অভিনয়ে ‘দেলুপি’ স্থানীয় গল্প হয়েও আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে বাংলাদেশের স্বাধীন সিনেমার সম্ভাবনাকে স্পষ্ট করে তুলছে।

মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম যা বললেন...
ওটিটি প্লাটফর্মে আলোচিত দুই সিরিজ ‘শাটিকাপ’ ও ‘সিনপাট’– এরপর এবার বড় পর্দার জন্য নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম বানিয়েছিলেন ‘দেলুপি’। নির্মাতা আরও বলেন, ‘দেলুপির গল্প শুধু একটি অঞ্চলের নয়; বরং দেশের সর্বস্তরের মানুষের জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারবে। সিনেমার শুটিং থেকে শুরু করে অভিনয়শিল্পী– সবকিছুতেই স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গল্পেই লুকিয়ে আছে সিনেমার শক্তি।’ রটারড্যাম উৎসবে যোগদান করে তাওকীর জানান, রটারড্যামের ব্রাইট ফিউচার বিভাগে লড়ছে দেলুপি। ইতোমধ্যে সিনেমাটির দুটি প্রদর্শনী হয়েছে। আইএফএফআর ২০২৫-এ অংশগ্রহণকারী চলচ্চিত্র নির্মাতা, চলচ্চিত্রকর্মী, চলচ্চিত্রপ্রেমী, প্রেসের অনেকেই প্রদর্শনীতে ছিলেন। সেখানে আমরা প্রশ্ন উত্তর পর্বেও অংশ নিয়েছি। আগামী ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারিতে আরও দুটি প্রদর্শনী রয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা দারুণ।
টাইগার কম্পিটিশনে রইদ:
রটারড্যাম উৎসবের সবচেয়ে আলোচিত বিভাগ টাইগার কম্পিটিশনের জন্য অফিসিয়ালি নির্বাচিত হয়ে অংশ নিয়েছে মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘রইদ’। ‘হাওয়া’র পর নির্মাতার দ্বিতীয় এই সিনেমা নিয়ে তিনি খুব বেশি কিছু বলতে চান না– শুধু বলেন, এটি একটি প্রেমের গল্প। তবে সেই প্রেম একা নয়, সঙ্গে আছে চারপাশের জীবন, সময় আর বাস্তবতা। গত ফেব্রুয়ারি ২ ও ৩ তারিখে সিনেমাটির দুটি প্রদর্শনী হয়। আজ রয়েছে একটি প্রদর্শনী। এ ছাড়াও আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি প্রদর্শিত হবে ‘রইদ’। মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষির অভিনয়ে নির্মিত এই সিনেমার দৃশ্যধারণ হয়েছে সুনামগঞ্জে। ভাষা বা আঞ্চলিকতার গণ্ডিতে আটকে না থেকে ‘রইদ’ বাংলাদেশের সব অঞ্চলের অনুভূতিকে প্রতিনিধিত্ব করতে চায়। রটারড্যাম থেকে শেয়ার করা এক পোস্টে তুষি লিখেছেন– ‘হিম হয়ে যাওয়া শীতল শহরে, রইদ উঠেছে রটারড্যামে’– এই এক লাইনের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে পুরো রইদ টিমের অনুভূতি।

মেজবাউর রহমান সুমন যা বললেন...
২০২২ সালে ব্যাপক সাফল্য পাওয়া ‘হাওয়া’ সিনেমার পর সুমনের এটি দ্বিতীয় সিনেমা ‘রইদ’। মুক্তির পর ‘হাওয়া’ বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিসে স্থান করে নিয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে অস্কারে মনোনয়নও পেয়েছিল। ‘রইদ’ সিনেমাটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে এক যুগলের প্রায় নিভৃত জীবনকে কেন্দ্র করে আবেগ, আকর্ষণ ও সম্পর্কের গভীরতা অনুসন্ধান করে। গল্পের মূল চরিত্র, লাজুক এক পুরুষ, তাঁর অস্থির স্ত্রীকে বারবার অজানা জায়গায় ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে; কিন্তু প্রতিবারই স্ত্রী ফিরে আসে। সুমন বলেন, এই সিনেমা একটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। আমার মা আমাকে বলেছিলেন এমন একটি গল্পের কথা, যেখানে এক দম্পতি আমার দাদার বাড়িতে কাজ করতেন। স্বামী বারবার স্ত্রীকে ছেড়ে দিত, কিন্তু তিনি প্রতিবারই ফিরে আসতেন। এই পুনরাবৃত্তি আমাকে প্রাথমিক কোনো বন্ধনের অনুভূতি দিয়েছে, যা যুক্তি ছাড়িয়ে মানুষের মধ্যে গভীর সম্পর্ককে বোঝায়। রটারড্যাম উৎসবের সবচেয়ে আলোচিত বিভাগ টাইগার কম্পিটিশনে রইদ প্রতিযোগিতা করছে। বাস্তবতা, উৎসবে আসার পর এখন পর্যন্ত রইদের বড় প্রাপ্তি হচ্ছে সিনেমাটির জন্য সঙ্গে নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এমি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী প্রযোজক অপূর্ব বকশির প্রযোজনা সংস্থা উইডিশাস অরিজিনালস। গত ২ ও ৩ তারিখে সিনেমাটির দুটি প্রদর্শনী হয়। আজও রয়েছে একটি প্রদর্শনী। সব মিলিয়ে এখানে আমাদের রইদ নিয়ে এখানে অভিজ্ঞতা দারুণ।
বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশন বিভাগে মাস্টার:
রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের রাজনৈতিক থ্রিলার ‘মাস্টার’ লড়ছে উৎসবের বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশন বিভাগে। ১ ফেব্রুয়ারি সকালে হয় গণমাধ্যম ও ইন্ডাস্ট্রির জন্য সিনেমাটির প্রথম প্রদর্শনী। পরদিন ২ ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ৯টায় হয় সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার, সঙ্গে ছিল প্রশ্নোত্তর পর্বও। এক শিক্ষক জাহিরের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং তাঁর উত্থানের গল্পে নির্মিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন নাসিরউদ্দিন খান, আজমেরী হক বাঁধন ও জাকিয়া বারী মম। উৎসব চলাকালে রটারড্যাম থেকেই অভিজ্ঞতার মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিচ্ছেন বাঁধন, সঙ্গে দেখা যাচ্ছে পুরো টিমকে।

যা বললেন সিনেমাটির নির্মাতা সুমিত...
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সিনেমাটির বিষয়বস্তু আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সিনেমাটিতে এ আমি দেখাতে চেয়েছি, ক্ষমতা কীভাবে সবচেয়ে মহৎ মানবিক অনুভূতিকেও ক্ষয় করে দেয়। এটি একটি বৈশ্বিক বিষয়, তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রশ্নটি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। এই বড় পরিবর্তন আমাদের সমাজকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে, কিন্তু অন্যায়কে টিকিয়ে রাখে– এমন কাঠামোগুলো এখনও আমাদের তাড়া করে ফেরে। রডারড্যামে আমরা সিনেমাটি নিয়ে এসেছি। এখানে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের ঠিক আগেই বিখ্যাত কোয়ানন ফিল্মস আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে মাস্টার সিনেমাটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কোয়ানন ফিল্মস।
তিনটি সিনেমা, তিনটি বিভাগ, তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি– রটারড্যামের বিশাল পর্দায় এ যেন বাংলাদেশের সমকালীন চলচ্চিত্রের এক সম্মিলিত উপস্থিতি। নদীভাঙনের বাস্তবতা, প্রেমের নীরবতা কিংবা রাজনীতির উত্তাপ– সব গল্পই বলছে এই দেশের কথা, তবে আন্তর্জাতিক ভাষায়; যা ঢাকার সিনেমার নতুন ইতিহাসেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
