ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চলচ্চিত্র নির্মাণই বাঁচার রসদ, কাজই আমাকে টিকিয়ে রেখেছে: সুমিত

চলচ্চিত্র নির্মাণই বাঁচার রসদ, কাজই আমাকে টিকিয়ে রেখেছে: সুমিত
×

রটারডাম চলচ্চিত্র উৎসবে মাস্টার টিমকে নিয়ে পরিচালক সুমিত।

মীর সামী

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৩:৫৭ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:০৩

রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত। নির্মাতা। তাঁর নতুন পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘মাস্টার’ নেদারল্যান্ডসের মর্যাদাপূর্ণ ৫৪তম রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশনে পুরস্কার জিতেছে। এ সিনেমা ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা হয় তাঁর সঙ্গে

আপনার নতুন ছবি ‘মাস্টার’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব রটারড্যামে (IFFR) বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশনে সম্মাননা পেল। এ অর্জনকে কীভাবে দেখছেন?

নিঃসন্দেহে এটি আমার জন্য বড় স্বীকৃতি। ‘মাস্টার’ চলচ্চিত্রটি বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশনে লড়েছে বিশ্বখ্যাত সব নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীর কাজের সঙ্গে। প্রতিযোগিতায় ছিল অস্কার মনোনীত সিনেমা ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’র তারকা রেনাটা রেইনসভে অভিনীত ‘বাটারফ্লাই’, পিটার মুলেন অভিনীত ‘স্যার ওয়েদারফোর্ড’, ক্লাস ব্যাং অভিনীত ‘হোম’ এবং ইসাবেল স্যান্ডোভালের ‘মুনগ্লো’র মতো শক্তিশালী চলচ্চিত্র। এ তালিকায় জায়গা পাওয়াতেই আমরা আনন্দিত ছিলাম। বিশ্বমানের এ প্রতিযোগিতায় ‘মাস্টার’ শেষ পর্যন্ত সেরার মুকুট ছিনিয়ে নেয়। রটারড্যামে পুরস্কার জয় স্বপ্নের মতোই লাগছে। এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে ছবিটির সম্মাননা পাওয়া আমার জন্য অনেক আনন্দের।

‘মাস্টার’ সিনেমার মূল চরিত্র জাহিরের যাত্রা কীভাবে তুলে ধরেছেন?

জাহির একজন আদর্শ শিক্ষক, স্বামী ও বাবা। যে পরিবার ও নিজের কাজেই সুখ খুঁজে পায়। কিন্তু মহগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান হওয়ার পর তার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। শুরুতে সে ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই ক্ষমতায় আসে। তবে ধীরে ধীরে প্রত্যাশার চাপ, ক্ষমতার স্বাদ আর বাস্তবতার সংঘাতে সে নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করতে শুরু করে। এ সিনেমার মাধ্যমে আমি দেখাতে চেয়েছি একজন কমিউনিটি হিরো কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক পর্যায়ে কর্তৃত্ববাদীতে পরিণত হয়।

ছবিটি কি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে?

একদমই না। আমার লক্ষ্য কখনোই কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে আক্রমণ করা নয়। সিনেমাটির মাধ্যমে আমি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়গুলোর দিকেই নজর দিতে চেয়েছি। যেগুলো আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিবিদরা মিলেই টিকিয়ে রেখেছে। দোষীরা শাস্তি পাবে আর নির্দোষরা শান্তিতে বাঁচবে– এই সহজ সমীকরণই আমাদের সমাজে বারবার ভেঙে পড়ে। 

ছবিতে বনাঞ্চলবাসী এক জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদের বিষয়ও তুলে ধরেছেন। এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

প্রান্তিক মানুষদের উচ্ছেদ এবং যথাযথ পুনর্বাসন পরিকল্পনার অভাব আমাদের নীতিনির্ধারণের বড় ব্যর্থতা। এসব মানুষ বছরের পর বছর অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। যদি আমরা সত্যিই এসব অন্যায় ঠিক করতে চাই, তাহলে রাজনৈতিক বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও সহযোগিতা দরকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এই সহযোগিতার মানসিকতা এখন খুবই কম। সেটি আমাকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে।

দেশের সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছবিটি কতটা জরুরি বলে মনে করেন?

আমি মনে করি, এটি এ সময়ের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ‘মাস্টার’-এ আমি অনুসন্ধান করেছি কীভাবে ক্ষমতা সবচেয়ে মহৎ মানবিক প্রবৃত্তিকেও ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়। এটি একটি বৈশ্বিক থিম হলেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এই বড় পরিবর্তন আমাদের সমাজকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে ঠিকই, কিন্তু যে ব্যবস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অবিচারকে টিকিয়ে রেখেছে, সেগুলো এখনও আমাদের পিছু ছাড়েনি। এটিই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আপনার জীবন এক ধরনের ‘রাজনৈতিক থ্রিলার’; বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন?

আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত । কিন্তু আমি নিজে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কখনোই যুক্ত ছিলাম না। তবুও পারিবারিক পরিচয়ের কারণেই আমাকে লক্ষ্যবস্তু হতে হয়েছে। মামলা, হামলা, হুমকি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপবাদ–এ সবকিছুর মধ্য দিয়ে চলতে গিয়ে আমার জীবন যেন একপ্রকার ‘রাজনৈতিক থ্রিলার’-এ পরিণত হয়েছে। বলা যায়, দেড় বছর ধরে আমি দ্বৈত জীবন যাপন করছি। একদিকে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নিজের কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে পরিবারের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ানো। মিথ্যা অভিযোগে প্রিয়জনদের নামে দায়ের করা সাজানো মামলার বিরুদ্ধে লড়াই করাই ছিল আমার দৈনন্দিন বাস্তবতা। এ ছাড়াও ‘মাস্টার’ সিনেমায় মধুপুর ও ধনবাড়ি এলাকার যারা যুক্ত ছিলেন, অনেকেই এক বছরের বেশি সময় ধরে পরিবার দেখতে পারেননি। এমনকি নিজেদের গ্রাম বা বাজারেও তারা নিরাপদ নন।

এ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আপনার কাজে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

অবশ্যই। এ অভিজ্ঞতা আমার ভেতরে গভীর ছাপ ফেলেছে। যারা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তারা এই রাজনৈতিক নিপীড়নের বাস্তবতা ভালোভাবেই জানেন। যারা জানেন না, তারা জানবেন সেদিন, যেদিন এই অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি একটি চলচ্চিত্র বানাব। একদিন না একদিন এ গল্প আমাকে বলতেই হবে।

এত প্রতিকূলতার মাঝেও চলচ্চিত্র নির্মাণের শক্তি কোথা থেকে পান?

চলচ্চিত্র নির্মাণই আমার বাঁচার রসদ। সব চাপ, ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও এ কাজই আমাকে টিকিয়ে রেখেছে। গল্প বলা আমাকে শক্তি দেয়, আমাকে আবার দাঁড়াতে শেখায়। অনেক সময় মনে হয়েছে চারপাশের বাস্তবতা দমবন্ধ করে দিচ্ছে, কিন্তু সিনেমাই ছিল সেই আশ্রয়; যার ভেতর দিয়ে আমি নিজের অস্তিত্ব আর বিশ্বাসকে ধরে রাখতে পেরেছি। 

আরও পড়ুন

×