ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শোক

চোখের পানি থামাতে পারছি না

চোখের পানি থামাতে পারছি না
×

আশা ভোঁসলের সঙ্গে রুনা লায়লা। ছবি: সংগৃহীত

রুনা লায়লা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:০১

গান শোনেন কিন্তু আশা ভোঁসলের গান ভালোবাসেন না– এমন শ্রোতার সংখ্যা সত্যিই বিরল। তিনি সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দি ও বাংলা গানের জগতে রাজত্ব করেছেন। কঠিন রাগ থেকে শুরু করে হালকা ধ্রুপদি সুর, সেই সঙ্গে চিত্তাকর্ষক চলচ্চিত্রের গান–সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি ছিলেন সুরের সম্রাজ্ঞী। তাঁর প্রতিভা, দক্ষতা আর শ্রোতাদের বিমোহিত করার ক্ষমতা ছিল প্রশ্নাতীত।

ছোটবেলা থেকে তাঁর গান শুনে বড় হয়েছি। তাঁর কণ্ঠ আমার মতো লাখো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। বছরের পর বছর ধরে তাঁর সঙ্গে আমার এক সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। একসময় আমি শুধু তাঁর ভক্তই ছিলাম না, তাঁর বন্ধুও হয়ে উঠেছিলাম। তাই তো তাঁর চলে যাওয়ার খবর শুনে যেন ভেতরটা একেবারে ভেঙে পড়ল। মনে হলো, খুব কাছের কাউকে হারিয়ে ফেললাম। বারবার শুধু একটি কথাই মনে ভেসে উঠছে– ‘উফ্‌ আল্লাহ, এ আমি কী শুনলাম!’

এই তো গতকাল (শনিবার) রাতে তাঁর ভাইয়ের ছেলে বৈদ্যনাথ মঙ্গেশকরের সঙ্গে কথা বলছিলাম। ওর কাছ থেকেই জানতে পারি, আশাজির (আশা ভোঁসলে) শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তখন থেকেই মনটা খারাপ হয়ে আছে। কিন্তু কোথাও একটা আশা ছিল– তিনি ঠিকই আবার উঠে দাঁড়াবেন। কারণ, তিনি এমন মানুষ, যিনি সব বাধা জয় করে এগিয়ে যেতে জানেন।

আমাদের সম্পর্ক কিন্তু শুরু থেকেই এতটা ঘনিষ্ঠ ছিল না। ২০১২ সালে বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানের প্রতিযোগীদের নিয়ে ২০১২ সালে দুবাইয়ে আয়োজন করা হয় রিয়েলিটি শো ‘সুরক্ষেত্র’। এই রিয়েলিটি শোতে আমি, আশা ভোঁসলে আর আবিদা পারভীন একসঙ্গে বিচারকের দায়িত্ব পালন করি। সেই অনুষ্ঠান থেকেই আমাদের প্রথম পরিচয়, আর ধীরে ধীরে তা গড়ে ওঠে এক আন্তরিক বন্ধুত্বে। শুটিং সেটে কত আড্ডা, কত হাসি! সেই মুহূর্তগুলো আজও চোখের সামনে ভাসে। 

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও আমাদের যোগাযোগ ছিল। এই তো ২০১৯ সালে আমার সুরে ‘চলে যাওয়া ঢেউগুলো আর ফিরে আসেনি’ শিরোনামের একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন তিনি। এরপর মাঝে মাঝে ফোনে কথা হতো, কয়েকবার দেখা-সাক্ষাৎও হয়েছে। অনেক সময় মনে হয়েছে, তাঁকে ফোন করব। কিন্তু সেই ‘করব, করব’ করেই আর করা হয়নি। আজ মনে হচ্ছে, যদি আরেকবার কথা বলতাম! হয়তো আরও কিছু গল্প জমা থাকত স্মৃতির ভাঁজে।

আশা ভোঁসলে শুধু কিংবদন্তি শিল্পীই নন, অসাধারণ একজন মানুষও ছিলেন। যার সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক হয়েছে, তিনি মন খুলে মিশেছেন। আমার প্রতিও তাঁর আলাদা মায়া ছিল। আমি যখনই তাঁর কাছে গিয়েছি, কত যত্নই না করেছেন!

শিল্পী হিসেবে তিনি যে উচ্চতায় ছিলেন, তা নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। ছোটবেলা থেকেই তাঁর গান শুনে শুনে বড় হয়েছি। তাঁর কঠিন রাগাশ্রিত গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি, তাঁর অভিব্যক্তি অনুসরণ করেছি। সত্যি বলতে, তাঁর গানই আমার কণ্ঠের ভিত তৈরি করেছে।

এসব কথা আমি তাঁকে বলেছি। কিন্তু তিনি উল্টো আমাকে বলতেন, ‘আপনার গলায় যে কাজ আছে, তা আমাদের দিতে গেলে অনেক ভাবতে হতো।’ আমি অবাক হয়ে বলতাম, ‘আপনি কী যে বলেন! আপনার গান গেয়েই তো আমরা শিখেছি।’

তিনি আমাকে কী ভীষণ সম্মান করতেন! সব সময় ‘আপনি’, ‘রুনাজি’ বলে ডাকতেন। আমি বারবার বলতাম, ‘আমাকে নাম ধরে ডাকুন, তুমি করে বলুন।’ কিন্তু তিনি কখনও তা মানেননি। বলতেন, ‘না না, আপনি অনেক বড় একজন শিল্পী। আপনাকে এভাবেই ডাকব।’ তাঁর এই বিনয়, এই শ্রদ্ধাবোধই প্রমাণ করে তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন।

আজ যখন তাঁর কথা বলছি, তখন চোখের পানি থামাতে পারছি না। মনে হচ্ছে, আমার জীবনের একটি মূল্যবান অধ্যায় হঠাৎ শেষ হয়ে গেল। এই শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। বিশ্বসংগীত হারাল এক অসামান্য কণ্ঠ, পৃথিবী হারাল এক দুর্লভ রত্ন– যিনি ছিলেন অনন্য, অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং অপরিবর্তনীয়। আর আমি হারালাম এক আন্তরিক বন্ধু, এক প্রিয় মানুষকে। সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা, তিনি যেন আশাজিকে শান্তিতে রাখেন।

আশাজির এই চলে যাওয়ায় আমি খুব মিস করব আমাদের সেই দীর্ঘ ফোনালাপ, অন্তহীন গল্পগুলো। তাঁর কণ্ঠে আর কোনো দিন শুনতে পাব না ‘রুনাজি, আপ ক্যাসে হ্যায়?’

আরও পড়ুন

×