প্রদর্শনী থেকে কনসার্ট, বারবার বাধার মুখে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
কোলাজ: সমকাল
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ১৭:৫৩ | আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ | ১৭:৫৬
দেশের বিভিন্ন জেলায় গত এক বছরে সিনেমা, মঞ্চনাটক, বাউল, পালাগান ও আধুনিক ব্যান্ড সংগীতের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নানা ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। এ বছর নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের প্রত্যাশা ছিল, সংস্কৃতিচর্চায় আর বাধা আসবে না। সব শেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী স্থগিত হওয়ায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মিলনায়তনে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। তবে ‘কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ’ কর্মসূচি ঘোষণার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আয়োজকরা প্রদর্শনী স্থগিত ঘোষণা করেন।
গত বছর ঈদুল আজহায় টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রায়হান রাফী পরিচালিত ‘তাণ্ডব’ সিনেমার প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা। জেলা পরিষদের হল ভাড়া নেওয়া হয়েছিল নিয়ম মেনেই। কিন্তু প্রদর্শনী শুরু হওয়ার পর স্থানীয় একটি ধর্মীয় সংগঠনের বিরোধিতা শুরু হয়। আয়োজকদের দাবি, নানা ধরনের হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে শেষ পর্যন্ত তারা প্রদর্শনী বন্ধ করতে বাধ্য হন।
শুধু সিনেমা নয়, নাটকও একই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় দেশ নাটকের ‘নিত্যপুরাণ’ মঞ্চায়নের সময় একদল বিক্ষোভকারী নাটক বন্ধের দাবি জানায়। প্রথমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও পরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে নাটকটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন আয়োজকরা।
বাদ যায়নি সংগীতাঙ্গনও। গত ডিসেম্বরে ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল ব্যান্ড তারকা জেমসের কনসার্ট। অনুষ্ঠান শুরুর আগমুহূর্তে হামলা ও বিশৃঙ্খল ঘটনায় শেষ পর্যন্ত কনসার্ট বাতিল করা হয়।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ড কৃষ্ণপক্ষের কনসার্ট ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিও আলোচিত হয়েছিল। যদিও সেই ঘটনার পেছনে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণ ছিল না; শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সময় ও গভীর রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলা নিয়ে আপত্তি ছিল। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়, শিল্পীরা নিরাপত্তার আশঙ্কায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হন। একইভাবে সংগীত শিল্পী পড়শীর একটি কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ারও অভিযোগ আছে।সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা মনে করছেন, এসব ঘটনা একসঙ্গে রেখে দেখলে একটি প্রবণতা সামনে আসছে। তা হলো– কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় আপত্তি, কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধ, আবার কোনো ক্ষেত্রে সংগঠিত চাপ, সব শেষে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সংস্কৃতিচর্চা।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার নির্মাতা তানিম নূর বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই এটা দেখছি। এবার নিজের সিনেমাই ভুক্তভোগী। এভাব চললে তো দেশে সংস্কৃতিচর্চা সংকুচিত হতে থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দাবি জানাই, আমাদের সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ নিরাপদ করা হোক, প্রসারিত করা হোক। রাষ্ট্রকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে।’
বিশেষ্ট অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তারিক আনাম খান বলেন, ‘মানুষ হাসবে, খেলবে, শান্তিতে জীবন যাপন করবে, প্রতিটি ধর্মের, বিশ্বাসের মানুষ স্বাধীনভাবে তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজগুলো সম্পন্ন করবে, সেটাই তো হওয়ার কথা। অথচ বিশ্বের প্রতিটি দেশ যখন সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা সেখানে নিজেদের সংস্কৃতির টুঁটি নিজেরাই চেপে ধরছি– যা গর্হিত কাজ। রাষ্ট্রকে এর দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়াটা খুবই ন্যক্কারজনক। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন বলেন, ‘বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমা প্রদর্শনে বাধা দিয়ে তা স্থগিত করাটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। সংস্কৃতি অঙ্গনের ওপর একটা বড় ধরনের ধাক্কা। আমরা আশা করব, রাষ্ট্র এর বিপরীতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
বিষয়টি নিয়ে নির্মাতা আশফাক নিপুণ বলেন, সরকারকে যদি নাগরিকদের কাছে প্রমাণ করতে হয় তারা সংস্কৃতিবান্ধব, তাহলে কথায় কথায় যা মন চায়, তা বন্ধ করার সংস্কৃতি আইনগতভাবেই দমন করতে হবে। সেটা শুধু এই এক ছবিকে প্রদর্শিত হতে দিয়ে না, বরং ভবিষ্যতে কোনো ছবি যদি বনলতা এক্সপ্রেসের মতো জনপ্রিয় না-ও হয়, সেটাও যেন প্রদর্শিত হতে পারে, যে কোনো মুক্ত সংস্কৃতিচর্চা যেন বিকশিত হতে পারে, সেটা নিশ্চিত করার মাধ্যমে।
