ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

গান শুনে টেরই পাই না, কোনটা কার গান: আব্দুল হাদী

গান শুনে টেরই পাই না, কোনটা কার গান: আব্দুল হাদী
×

সৈয়দ আব্দুল হাদী। ছবি: সমকাল

এমদাদুল হক মিলটন

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ১৫:১৩

ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে কখনও কখনও এমন কিছু মুহূর্ত এসে ধরা দেয়, যা দীর্ঘদিন হৃদয়ে গেঁথে থাকে। তেমনই এক স্মরণীয় দুপুর কেটেছে গত শনিবার বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর বারিধারার বাসভবনে। আকাশি রঙের শার্ট পরিহিত শিল্পীকে দেখে মনে হলো– তিনি শুধু একজন গায়ক নন; বরং এমন একজন শিল্পী, যিনি জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে শিল্পের রঙে রাঙিয়ে তুলেছেন।

গত শুক্রবার সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘কালজয়ী কণ্ঠ: শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সৈয়দ আব্দুল হাদী’ শীর্ষক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।
এই উপলক্ষে পরদিন দুপুরে তাঁর বাসায় এক ঘরোয়া আড্ডার আয়োজন করা হয়। সেখানেই খোলামেলা নানা বিষয়ে কথা বলেন দেশের সংগীতাঙ্গনের এই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব।

আলোচনার শুরুতেই উঠে আসে সদ্যপ্রাপ্ত সম্মাননার প্রসঙ্গ। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যে কোনো পুরস্কারই আনন্দের। সত্যি বলতে, এত সম্মান পাওয়ার যোগ্য আমি কিনা, সে প্রশ্ন আমার নিজের কাছেই আছে। তবে জীবনের একটি পর্যায়ে এসে কোনো শিল্পীকে এভাবে সম্মানিত করা হলে তা অবশ্যই আনন্দের। আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমিকে। দীর্ঘ সংগীতজীবনে নানা সম্মাননা পেয়েছি, তবে মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। দেশের মানুষের কাছ থেকে আমি এই দুটোই পেয়েছি।’

ছয় দশকেরও বেশি সময়ের সংগীতজীবনে পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। একসময় নিয়মিত গান ও মঞ্চ পরিবেশনায় ব্যস্ত থাকলেও এখন আর নতুন গান কিংবা স্টেজ শোতে দেখা যায় না তাঁকে।

গান থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘গান গাওয়ার ইচ্ছাটা এখন অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গেছে। তা ছাড়া করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর শারীরিক কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আগে যেভাবে গান করতে পারতাম, এখন আর সেভাবে পারি না। তাই মনে হয়েছে, জীবনে যা করেছি, সেটুকুই সুন্দরভাবে থাক। সেটাকে নষ্ট করার কোনো মানে নেই। পুরোনো গানের রেকর্ডের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে শ্রোতাদের ফাঁকি দিতে চাই না। তবে শিল্পীর কখনও অবসর হয় না। নতুন গান বা মঞ্চে না থাকলেও আমি গানেই আছি। নিজের জন্য হলেও গান করতে হয়। সারাদিনই গুনগুন করে গান গাই। পেশাদারভাবে গান ছেড়েছি, কিন্তু নিজের জন্য গান করা ছাড়িনি। তা না হলে বেঁচে থাকব কী করে?’

বর্তমান সময়ের গান প্রসঙ্গে তাঁর মূল্যায়ন, ‘এখনকার বেশির ভাগ গানই আমার কাছে একই রকম মনে হয়। গান শুনে টেরই পাই না কোনটা কার গান। একটি গানকে কীভাবে শিল্পসম্মত করা যায়, সে চেষ্টার অভাব রয়েছে অনেকের মধ্যে। বরং কীভাবে গানকে ভাইরাল করা যায়, সেটাই যেন প্রধান লক্ষ্য। অথচ শ্রুতিমধুর গানই মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। ভাইরাল হওয়া অনেক গান ক্ষণস্থায়ী; শ্রোতার মনে স্থায়ী আসন গড়তে পারে না।’

দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আসুন, আমরা সবাই দেশটাকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবি, দেশটাকে ভালোবাসি এবং যার যার জায়গা থেকে দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি। কারণ আমার দেশের মতো এত সুন্দর দেশ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমরা যেন নিজেদের ভারে দেশটাকে ভারাক্রান্ত না করে ফেলি।’

শিল্পীর বাসভবন যেমন শিল্পের আবহে ভরপুর, তেমনি তাঁর কথাগুলোও ছিল সময়কে ছুঁয়ে যাওয়ার মতো গভীর ও প্রজ্ঞাময়। সুন্দর কিছু অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণা সঙ্গে নিয়ে যখন অফিসে ফিরছিলাম, তখন ঘড়ির কাঁটা বিকেল ৪টার দিকে এগিয়ে চলেছে।

আরও পড়ুন

×