সঞ্জয় যেভাবে শ্রীমঙ্গল থেকে ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে
সঞ্জয় দেব। ছবি: সংগীতশিল্পীর সৌজন্যে।
রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ১৫:৫১ | আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ | ১৮:০৫
সিনেমা, নাটক, গান, খেলা– সবকিছুতেই কি আমরা পিছিয়ে থাকব? এমন তো নয়, আমরা কেবলই ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছি। সংস্কৃতি অঙ্গনে আমাদেরও অনেক শিল্পী, সাধক আছেন; যারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন অভিনব আয়োজন তুলে ধরার প্রয়াসে। ক্রীড়া জগতেও সাফল্যে দেখা মিলেছে বিভিন্ন সময়। তাহলে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা কেন সুযোগ পাব না, নিজেদের চেনাতে? এমন অনেক প্রশ্ন মনের মাঝে ঘুরপাক খায়। সে কারণে আশার জাল বুনে যাই এমন কিছু দেখার, যা আমাদের গর্বিত করবে। অবশেষে তেমনই এক গর্বিত মুহূর্ত আমাদের সামনে ধরা দিল ‘বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬’-কে ঘিরে। অবাক বিস্ময় নিয়ে আমরা দেখলাম, বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে কীভাবে সঞ্জয় নামে এক তরুণ শিল্পী গানে গানে পরিচয় করিয়ে দিলেন বাংলাদেশকে।
সঞ্জয়ের জন্ম বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। চট্টগ্রামে কাটিয়েছেন শৈশবের বড় একটি অংশ তিন বছর বয়স থেকেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত শেখা শুরু তাঁর। ১১ বছর বয়সে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। খেলাধুলা বা অন্য কোনো বিষয়ে না জড়িয়ে সংগীতকে জীবনের আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে শিল্পী ও সংগীতায়োজক হাবিব ওয়াহিদ এবং ফুয়াদ আল মুক্তাদিরের সৃষ্টি তাঁকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে ইয়ান্নি, হ্যান্স জিমার, এ আর রহমান, স্ক্রিলেক্স, ডেডমাউস, ক্যালভিন হ্যারিসসহ বিশ্বসংগীতের আরও বেশ খ্যাতিমান শিল্পী ও সংগীতায়োজকদের সৃষ্টিতে বুঁদ হয়ে ছিলেন তিনি। সে কারণে বাংলা গান এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে আধুনিক ধারার মিশ্রণের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে আসছেন। আর এই কাজটি তাঁর সংগীতচিন্তাকে আরও গভীরে নিয়ে গেছে।

তবে সংগীতের এই যাত্রায় ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিলেন তাঁর মা। সঞ্জয়ের কথায়, মা-ই আমাকে ছোটবেলায় সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তবলা শেখার জন্য ভর্তি করিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তাল-লয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি সবসময় আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং আমার স্বপ্নে বিশ্বাস রেখেছেন। একজন শিল্পী হিসেবে আমি যা হয়েছি, তার শুরুটা মায়ের কাছ থেকেই। ছোটবেলা থেকেই মাথায় নানা সুর আসত, আর সেগুলো গান আকারে সাজানোর চেষ্টা করতাম। ১৩তম জন্মদিনে একটি ল্যাপটপ উপহার পাই। তখনই ‘রিজন’ নামে সংগীত তৈরির সফটওয়্যার আবিষ্কার করি। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত সংগীত তৈরি থামাইনি।’ সঞ্জয়ের এক কথা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, সংগীত মাধ্যমে তাঁর জীবনের অধ্যায়গুলো– এ যেন বহুকাল আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। তাইতো বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী আয়োজনে তাঁকে পারফর্ম করতে দেখা মোটেও অবাক করে না।
১২ জুন শুক্রবার ছিল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন, যেদিন কানাডার টরন্টোর বিএমও স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’ এর উদ্বোধনী আয়োজনে সংগীত পরিবেশন করেন সঞ্জয়। ‘সির সির’ শিরোনামের সেই গানে তাঁর সঙ্গী ছিলেন বলিউডের এ সময়ের আলোচিত তারকা, কানাডীয় শিল্পী নোরা ফাতেহি ও ফরাসি হিপহপ তারকা ভেজেড্রিম। সেদিন কোটি ফুটবলপ্রেমীর সামনে দাঁড়িয়ে তারা যে পরিবেশনা তুলে ধরেন, তা দারুণভাবে আন্দোলিত করেছে এ দেশের দর্শক-শ্রোতাদেরও। তবে সবকিছু ছাপিয়ে নজর কেড়েছে সঞ্জয়ের বিশেষ জ্যাককটি। ডান হাতাজুড়ে সু এমব্রয়ডারিতে ফুটে উঠেছিল বাংলাদেশের পরিচয়ের তিনটি শক্তিশালী প্রতীক– রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় ফুল শাপলা এবং লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা। শুধু পোশাকে এসব প্রতীক ব্যবহার করেই থেমে থাকেননি তিনি।

পারফরম্যান্স চলাকালে বারবার নিজের হাতার দিকে ইঙ্গিত করে বিশ্বের প্রতিটি দেশের দর্শকের নজর সেদিকেই টেনে নিয়েছেন। গানে গানে দেশের পরিচিতি তুলে ধরার অভিনব এই পরিকল্পনা নিয়ে সঞ্জয় বলেন, ‘যেদিন ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমার পারফর্ম করার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে, সেদিন থেকে ভাবতে শুরু করেছি, আমার পরিবেশনা কতটা আলাদাভাবে তুলে ধরা যায়। অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জার্সি পরে পারফর্ম করার। কিন্তু এই বিষয়টি আমার কাছে অনেক গৎবাধা মনে হয়েছে। তাঁর বদলে আরও নান্দনিক কিছু তুলে ধরা যায় কিনা, তা নিয়ে আলাদা করে ভাবতে বসেছি। যদিও আগে থেকে জানা ছিল, আমার ও ভেজেড্রিমের ‘সির সির’ গানটি ফিফার অফিসিয়াল অ্যালবামে থাকছে। কিন্তু এই গানের সঙ্গে কীভাবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আয়োজন সাজানো হবে, তা নিয়ে কোনো ধারণা ছিল না। এজন্য আমার টিমের সঙ্গে বসে পরিকল্পনা করি, কীভাবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করা যায়। এরপর আমার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ছায়া কুমারের সঙ্গে মিলে এই জ্যাকেটের নকশা তৈরি করি। যার প্রতিটি মোটিফের পেছনেই ছিল একটি বার্তা। পোশাকের হাতায় তুলে ধরা রয়েল বেঙ্গল টাইগার হলো বাংলাদেশের শক্তি ও সাহসের প্রতীক। শাপলা তুলে ধরে দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয়। আর জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ রংয়ে মিশে আছে শান্তি, সৌহার্দ ও পরিচয়ের গল্প। তবে সবকিছু পরিকল্পিতভাবে হলেও মঞ্চে দাঁড়িয়ে বারবার হাতার নকশা দর্শকদের দেখানো বিষয়টি হঠাৎ করেই হয়ে গেছে।’
কিভাবে হলো? এ প্রশ্নের জবাবে সঞ্জয় স্বীকার করেন, আবেগের বশেও আমরা অনেক কিছু করে ফেলি। এই বিষয়টাও তেমনি। তবে এও মনে হয়, অচেতন মনে বাংলাদেশকে দেখানোর ইচ্ছাটা পুষে রেখেছিলাম। সে কারণে হয়তো মঞ্চে ওঠে মনে হয়েছে, আমার সঙ্গে পুরো বাংলাদেশ আছে। অনুষ্ঠানের আগে যখনই জ্যাকেটটি পরতাম, আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে যেত। আর বিশ্বকাপের মঞ্চে ওঠার পর সেই অনুভূতি আরও তীব্র হয়। তাই শেকড়ের টান উপেক্ষা করতে পারিনি, তাঁকে চিনিয়ে দেওয়ার দায় অনুভব করেছি। আর তা করতে গিয়ে খানিকটা গর্বও হয়েছে।’
- বিষয় :
- সংগীতশিল্পী
