ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল–এই মিলে বাংলাদেশ, এর বাইরে আমরা কিছু না: অণিমা

রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল–এই মিলে বাংলাদেশ, এর বাইরে আমরা কিছু না: অণিমা
×

অনিমা রয়। ছবি: সংগৃহীত

এমদাদুল হক মিল্টন

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ১৩:১৩ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ | ১৩:১৪

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের উদ্যোগে আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই দিনব্যাপী পঞ্চম রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত উৎসব। উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ড. অণিমা রায়। উৎসব, রবীন্দ্র-নজরুলভাবনা, সমকালীন সংগীতচর্চা এবং বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয় তাঁর সঙ্গে

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত উৎসবকে কীভাবে সাজিয়েছেন?

উৎসবের প্রথম দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দ্বিতীয় দিন জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ওপর থাকছে আয়োজন। গান, গীতিনাট্য চিত্রাঙ্গদা, লেটো পালা থাকছে। দুই কবির গানের আঙ্গিকে যতগুলো ধারা আছে, সব ধারাকে আমরা মঞ্চে উপস্থাপন করব। আমাদের চেষ্টা থাকবে সামগ্রিকভাবে এই দুইজনকে উপস্থাপন করার। সবাই মিলে আমরা যে একটি গাছ, আমরা অসাম্প্রদায়িক তা উৎসব লোগোতে ফুটে উঠেছে। এর আগে সংগীত উৎসবসহ নানা আয়োজন হয়েছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে।  এবারই প্রথম হচ্ছে রবীন্দ্র-নজরুল উৎসব। প্রথম দিন প্রধান অতিথি থাকছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। দ্বিতীয়দিন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ প্রধান অতিথি হিসেবে থাকছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ আয়োজনে সহযোগিতা করছে। 

সমসাময়িক আয়োজন থেকে এটি কতটা ভিন্ন?

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগ থেকে যখন কোনো আয়োজন করা হয় তা নিঃসন্দেহে আলাদা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগ, শান্ত মারিয়ামে সংগীত বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা এতে পারফর্ম করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরাও থাকবেন আয়োজনে। কোনো কিছু যেন বাদ না থাকে সেদিকে আমাদের লক্ষ্য ছিল। 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র-নজরুল উৎসব আয়োজনের উদ্দেশ্য কী?

আমরা সকলে এক। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল–এই মিলে বাংলাদেশ। এর বাইরে আমরা কিছু না। তারাই আমাদের সংস্কৃতি শিখিয়েছে, ভাষা, আনন্দ উদযাপন শিখিয়েছে। একের পাশে অন্যকে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন মানবতা। বিপদে সংকটে সংগ্রামে কীভাবে বাঙালিকে রুখে দাঁড়াতে হয় তা শিখিয়েছেন। অনেকটা সময় আমরা কাটিয়াছি দোলাচলে। একটা শঙ্কার মধ্যে রাত কেটেছে। এখন স্বস্তির বাতাস বইছে। সেই স্বস্তির বাতাসে আমরা দুই কবিকে বন্দনা করতে চাই। এই দুই কবি কেবল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পদ নন, তারা মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সৌন্দর্যবোধের অনন্য পথপ্রদর্শক। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এমন উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীল ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করছি।

রবীন্দ্র-নজরুল উৎসব নিয়ে আপনার প্রত্যাশা... 

রবীন্দ্র ও নজরুল ছাড়া আমাদের সংস্কৃতি অনেকটাই ব্যর্থ। অনেকটাই অব্যক্ত। দুই কবির প্রয়োজন তুলে ধরা এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। উৎসব শুধু দুই দিনের অনুষ্ঠান হয়ে না থাকুক; এটি যেন শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিমনা মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু মুসলমান–কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয় আমরা সকলে সমান। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের আদর্শ নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক। তাহলেই আমাদের আয়োজন সার্থক হবে। 

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা আজকের সময়ে কতটা?

আমি মনে করি, আজকের সময়ে তাদের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। ভালো কবিতা, গান লিখতে চাইলে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে জানতে হবে। যদি কেউ না জানে একটা সময় সে হেরে যাবে। থমকে দাঁড়াবে। একজন নজরুল-রবীন্দ্রনাথ বোঝা আর্কিটেক্সচারের কাজের ধরনই আলাদা হবে। সাধারণ মানুষও যদি রবীন্দ্রনাথের গান শোনেন তাঁর চলনবলন ও ধরন আলাদা হয়ে হবে। শুদ্ধতার সঙ্গে সত্যিকারের দেশপ্রেম যদি আমাদের মনে জাগ্রত করতে হয় তাহলে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে। কাউকে পেছনে রেখে আমরা এককদমও এগিয়ে যেতে পারব না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মানবতার শিক্ষা দেন, আর নজরুল শেখান অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সাম্যের বাণী। সমাজে যখন বিভাজন, অসহিষ্ণুতা কিংবা মূল্যবোধের সংকট দেখা দেয়, তখন তাদের সাহিত্য ও সংগীত আমাদের পথ দেখাতে পারে। তরুণদের কাছে এই দুই কবির চিন্তা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রচর্চা কেমন হচ্ছে? 

বেশ চর্চা হচ্ছে। রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা মানবিক সমাজ গঠনের শক্তি। বর্তমান সরকার চলতি বছরকে ‘নজরুলবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। বছরব্যাপী নজরুলের গান প্রচারিত হবে। সামনে বছর হয়তো রবীন্দ্রবর্ষ ঘোষণা করা হবে। আশার কথা হলো, সংগীত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রবীন্দ্র-নজরুলসংগীতের প্রতি আগ্রহ এখনও অনেক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গানের ক্লাস, আর্টের ক্লাস চালু করার ভাবনা বর্তমান সরকার করেছে। অবশ্যই এটি ভালো উদ্যোগ। 

বর্তমান সংগীতাঙ্গনকে কীভাবে দেখছেন?

সংগীত অঙ্গনে অনেক কাজ হচ্ছে। মাঝখানে কিছুদিন হতাশার সময় গেছে। আমরা সেটি কাটিয়ে উঠেছি। এখন ভালো সময় যাচ্ছে। শিল্পীদের ব্যস্ততা বাড়ছে। সংগীতাঙ্গনে এখন অনেক সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে শিল্পীরা দ্রুত শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারছেন। আরও সুন্দর সময় সামনে অপেক্ষা করছে। 

সম্প্রতি বিশ্বসংগীত দিবসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে গান পরিবেশন করেছেন। অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আমি রবীন্দ্রনাথের গান করি। অনুষ্ঠানে অনেক ব্যান্ড ও আধুনিক গানের শিল্পীরা এসেছেন। সবার সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হয়েছে। সেদিন ঢাকা শহরে বৃষ্টি হয়েছিল। বৃষ্টি উপেক্ষা করেও সবাই আয়োজনটিতে এসেছেন। এই প্রথমবার আমি মঞ্চে ইংরেজি গান করেছি। এ ছাড়া ‘ধনধান্য পুষ্পভরা...’, ‘মাঝে মাঝে তবু দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?...’ গেয়েছি। শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে বিভিন্ন ঘরানার শিল্পীদের সঙ্গে অংশ নিতে পারা আনন্দের। সংগীত মানুষের মধ্যে যে ঐক্য ও সৌহার্দ্য তৈরি করে, সেই বার্তাই এমন আয়োজনের মাধ্যমে আরও শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

এই সময়ের গানের ব্যস্ততা নিয়ে কিছু বলুন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিয়ে বেশি ব্যস্ত। বিভাগটিকে কীভাবে আরও সাজিয়ে তোলা যায় সে চেষ্টা করছি। মঞ্চ পরিবেশনা, বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ–সব মিলিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। পাশাপাশি নতুন কিছু সংগীত পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছি। 

আপনার প্রতিষ্ঠিত সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘সুরবিহার’-এর কার্যক্রম কেমন চলছে?

খুব ভালো চলছে। ‘সুরবিহার’-এ আমরা শুধু গান শেখাই না, সংগীতের নন্দনতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নিয়েও কাজ করি। এখানে বছরজুড়েই উৎসব আয়োজন করে থাকি। আগামী ৩ জুলাই বর্ষামঙ্গল উৎসব ও আগামী ১৪ আগস্ট ‘প্রকৃতি উৎসব’ আয়োজন করতে যাচ্ছি। এবার ছয় ঋতুকে নিয়ে হবে আয়োজন। 

বিশ্বকাপ ফুটবল এলে কোন দলের সমর্থন করেন?

ছোটবেলা থেকে আর্জেন্টিনার খেলা ভালো লাগে। এবার বিশ্বকাপে প্রিয় দল আর্জেন্টিনাই কাপ জিতবে। তাদের নান্দনিক ফুটবল আমাকে মুগ্ধ করে। আমি মূলত সুন্দর খেলাটাই উপভোগ করি। বিশ্বকাপ মানুষের মধ্যে যে আনন্দ ও উৎসবের আবহ তৈরি করে, সেটিই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করি।

 

আরও পড়ুন

×