আজ জন্মদিন তোমার…
৩৯ বছরে পা রাখলেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। গ্রাফিক্স: অভিষেক শীল
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ১৬:৫৯ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ | ১৭:৩৫
লিওনেল আন্দ্রেস মেসি- একটি নাম, একটি মিথ। যে নামটি প্রকারান্তে ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। যার বাম পায়ের জাদুতে বুঁদ হয়ে আছে গোটা বিশ্ব। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তার পায়ের জাদু আজও রহস্য আর বিস্ময়ে ঘেরা। সে রহস্যের দেয়াল আজ পর্যন্ত অভেদ্য। রেকর্ড, ট্রফি, গোল কিংবা ব্যক্তিগত অর্জনের ঊর্ধ্বে উঠে মেসি হয়ে উঠেছেন কয়েক প্রজন্মের স্বপ্ন, অনুপ্রেরণা ও আবেগের নাম। সেই মেসির আজ জন্মদিন।
ফুটবলের সবুজ ক্যানভাসে লিওনেল মেসি এক শিল্পীর নাম। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া সেই ছোট্ট ছেলেটি যে একদিন পুরো ফুটবল দুনিয়ার ব্যাকরণ বদলে দেবে, সেটা হয়তো স্বয়ং ফুটবল দেবতা আগেই লিখে রেখেছিলেন। ফুটবলের ইতিহাসের সঙ্গে অনেক কিংবদন্তির নাম জড়িয়ে আছে। কেউ দুই হাত ভরে শিরোপা জিতেছেন, কেউ অসংখ্য রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন, কেউ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছেন। কিন্তু খুব কম ফুটবলারই আছেন, যারা ‘মেসি’ হতে পেরেছেন।
মেসির ‘মেসি’ হয়ে ওঠার পথটা সহজ ছিল না। ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া ছোট্ট ছেলেটির সামনে ছিল অনিশ্চয়তা, সংগ্রাম আর সীমাবদ্ধতায় ভরা এক পথ। সেই শিশুটি একদিন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার এবং কোটি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠবেন—সেটা হয়তো তার পরিবারও কল্পনা করেনি।
মেসির বাবা হোর্হে হোরাসিও মেসি কাজ করতেন একটি স্টিল কারখানায়। মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। সেই পরিবারে জন্ম নেওয়া মেসির শরীরে শৈশবে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। চিকিৎসার ব্যয় বহন করা ছিল পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। স্থানীয় ক্লাবগুলোও মেসির দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হয়নি। ঠিক সেই সময় তার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে স্পেনের ক্লাব বার্সেলোনা। ক্লাবটির ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাচ মেসির খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে চুক্তির জন্য কাগজ না পেয়ে একটি ন্যাপকিনে লিখে তাকে দলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান।
পরের ইতিহাস সবারই জানা। বার্সেলোনার জার্সিতে মেসি হয়ে ওঠেন এক বিস্ময়ের নাম। নিজেকে নিয়ে যান অন্যন্য উচ্চতায়। ক্লাবটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি তিনি জয় করেন ১০টি লা লিগা, ৭টি কোপা দেল রে, ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ৩টি ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা। বার্সেলোনার জার্সিতে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল করেন এই ফুটবল জাদুকর।
ক্লাব ফুটবলে সফলতম এই ফুটবলারই জাতীয় দলের জার্সিতে মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখে আসছিলেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয় কিংবা ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে ডাগআউটে বসে শিশুর মতো কান্না ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, ব্যর্থতা আর সমালোচনার পর ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় শিরোপা জেতার স্বাদ পান মেসি। তবে নিয়তি তার জন্য সবচেয়ে বড় মঞ্চটা সাজিয়ে রেখেছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচ হারের পর সমালোচনায় বিদ্ধ দলকে নিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসেন এই মহাতারকা। তার হাতে ধরা দেয় ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্খিত ট্রফি-বিশ্বকাপ শিরোপা। বিশ্বকাপ জয়ের পরও থেমে থাকেননি মেসি। ২০২৪ সালেও দলকে কোপা আমেরিকা জিতিয়েছেন, ভেঙেছেন একের পর এক রেকর্ড।
মেসির ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকাও ঈর্ষণীয়। রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর, একাধিকবার ফিফা দ্য বেস্ট, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শ্যু, বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল- একজন ফুটবলারের পক্ষে জেতা যায় এমন প্রায় সব পুরস্কারই তার ট্রফি কেবিনেটে জায়গা করে নিয়েছে।
এসব অর্জন ও পরিসংখ্যান দিয়ে মেসিকে বর্ণণা করা সম্ভব নয়। মেসির আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মাঠে তার ড্রিবলিংয়ে, নিখুঁত পাসে, এবং ফুটবলে তার প্রতিটি স্পর্শে। তার বিশেষত্ব লুকিয়ে আছে সেই বাঁ-পায়ে, যা দিয়ে তিনি সবুজ ঘাসের ওপর ছবি আঁকেন।
আজ সেই শিল্পীর জন্মদিন। ৩৯ বছরে পা রাখা মেসির গল্প এখনো শেষ হয়নি। সব গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নাম্বার টেন। সেখানেও সাফল্য তার পায়ে লুটিয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যেই পেয়েছেন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিকের স্বাদ, অর্জন করেছেন বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব।
আর্জেন্টাইন অধিনায়কের কাছে বয়স যেন কেবলই একটি সংখ্যা। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, খেলার ধরণ বদলেছে। কিন্তু মেসির নামটি এখনও উচ্চারিত হচ্ছে প্রতিপক্ষ দলের রক্ষণভাগের আতঙ্ক হিসেবে। যে আতঙ্কের সঙ্গে মিশে আছে ফুটবলের সৌন্দর্য আর শিল্পের ছোঁয়া।
