মুস্তাফা মনোয়ারের সৃষ্ট পাপেটে ছিল প্রাণের স্পর্শ
‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানে নিজের তৈরি প্রিয় তিন চরিত্র বাউল, পারুণ ও ষাঁড়ের সঙ্গে মুস্তাফা মনোয়ার
আনন্দ প্রতিদিন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ১৫:২৭ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ১৫:২৮
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ার এমন এক নাম, যিনি চিত্রকলা, টেলিভিশন, নাটক ও পাপেট শিল্প—সব ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন অনন্য অবদান। তবে পাপেট শিল্পকে আধুনিক রূপ দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর সৃষ্ট পাপেট চরিত্র পারুল, বাউল ও ষাঁড় আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দেশীয় লোকজ ঐতিহ্য, গ্রামীণ জীবন ও বাঙালির সংস্কৃতিকে তিনি পাপেটের মাধ্যমে নতুনভাবে তুলে ধরেন। পারুল ছিল গ্রামবাংলার সরল, প্রাণবন্ত এক কিশোরীর প্রতিচ্ছবি। তার কথাবার্তা, আচরণ ও উপস্থাপনায় ফুটে উঠত বাংলার মাটির ঘ্রাণ। একসময় এই চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন তামান্না তিথি।
১৯৯৪ সালে মুস্তাফা মনোয়ার শিশুদের শিক্ষামূলক পাপেট অনুষ্ঠান মনের কথা শুরু করেন। তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও শিশুতোষ পাপেট অনুষ্ঠান মনের কথা-এর শিল্পী অনুকূল দাস। এক স্মৃতিচারনায় তিনি বলেন, প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে কাজ করেছি। চারুকলায় অধ্যয়নরত অবস্থায় একটি পাপেট কর্মশালায় অংশ নিতে গিয়ে প্রথম তার সঙ্গে পরিচয়। এরপর পাপেট শিল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যাই।’
সেই শুরু থেকেই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত অনুকূল দাস। সেখানে তিনি পারুল পাপেট চরিত্র পরিচালনা, পাপেট নির্মাণ ও নকশার দায়িত্ব পালন করেছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে মুস্তাফা মনোয়ার যখন সব কাজ নিজে করতে পারতেন না, তখন তার কাছ থেকে শেখা অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অনেক দায়িত্বই পালন করেছেন তিনি।

অনুকূল দাস আরও বলেন, ‘স্যার একদম কাজপাগল মানুষ ছিলেন। কাজের বাইরে তাকে চিন্তাই করা যেত না। ছাত্রজীবন থেকেই তার কর্মশালায় কাজ করতে করতে আমরাও সেই কাজের মধ্যেই ডুবে যাই।’ অন্যদিকে মুস্তাফা মনোয়ারের আরেক স্মৃষ্টি বাউল চরিত্রে উঠে আসত লোকজ দর্শন, মানবতার বাণী এবং বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি। এই চরিত্রে ২০০৩ সাল থেকে কণ্ঠ দিতেন মজিবর রহমান জুয়েল।
তিনি বলেন, ‘তিনি কঠিন কাজকেও অনেক সহজে করে ফেলতে পারতেন। অনেকটা গল্পের ছলে আমাদের দিয়ে কাজটি করিয়ে নিতেন। তার সঙ্গে কাজ করা আমার জীবনের সেরা সময়গুলো একটি। আর ষাঁড় ছিল ব্যতিক্রমী এক চরিত্র, যার উপস্থিতি পাপেট পরিবেশনাকে আরও প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় করে তুলত। এই চরিত্রে কণ্ঠ দিতেন কামাল আহসান বিপুল। তিনি বলেন, আমার কণ্ঠদেওয়া চরিত্রের মধ্যে অন্যতম হলো ষাঁড় চরিত্রটি।’
পারুল, বাউল এবং ষাঁড় চরিত্রগুলো শিশুদের যেমন আনন্দ দিত, তেমনি বড়দের কাছেও ছিল সমান জনপ্রিয়। একাধিক প্রজন্ম এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে বেড়ে উঠেছে।
মুস্তাফা মনোয়ার আজ আর নেই। তবে তাঁর সৃষ্ট পারুল, বাউল ও ষাঁড় কেবল তিনটি পাপেট চরিত্র নয়; এগুলো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক। যতদিন বাংলা সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে, ততদিন তাঁর সৃষ্টিগুলোও বেঁচে থাকবে মনে করছেন সংস্কৃতিবোদ্ধারা।
- বিষয় :
- মুস্তাফা মনোয়ার
