ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

মনোনয়ন বাতিল নিয়ে প্রশ্ন, ফের অনিশ্চয়তায় প্রযোজক সমিতির নির্বাচন

মনোনয়ন বাতিল নিয়ে প্রশ্ন, ফের অনিশ্চয়তায় প্রযোজক সমিতির নির্বাচন
×

আশরাফ উদ্দিন আহমেদ ও খোরশেদ আলম খসরু।

অনিন্দ্য মামুন

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৪:৩০ | আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৪:৩০

দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতিতে নির্বাচিত নেতৃত্ব ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। আগামী ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নির্বাচন। কিন্তু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের দুই আলোচিত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের পর নির্বাচন ঘিরে আবারও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি প্রকাশিত বৈধ প্রার্থীর তালিকায় সভাপতি পদপ্রার্থী খোরশেদ আলম খসরু এবং সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী সামসুল আলমের মনোনয়ন বাতিল করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে তারা নির্বাচন আপিল বোর্ডের কাছে আপিল করেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে নির্বাচনের তফসিলেও প্রভাব পড়তে পারে।

দীর্ঘদিনের প্রশাসকনির্ভর সমিতি

চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশকদের শীর্ষ এই সংগঠনটি দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচিত নেতৃত্বের পরিবর্তে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভোটার তালিকা, গঠনতন্ত্র এবং আইনি জটিলতার কারণে প্রতিবারই প্রক্রিয়া থমকে গেছে। ফলে কার্যকর নেতৃত্বের অভাবে চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও দীর্ঘদিন ঝুলে রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই। এরপর নতুন নির্বাচন আয়োজনের একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সমিতির নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বড় বিরোধ তৈরি হয় ভোটার তালিকা এবং ভোটাধিকারকে কেন্দ্র করে। আগে একজন প্রযোজক একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে ‘আমমোক্তারনামা’র মাধ্যমে অতিরিক্ত ভোটাধিকার পেতেন। সমিতির একাংশ দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছিল। ২০২২ সালের ২১ মে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ভোটগ্রহণের দিন হাইকোর্টের নির্দেশে তা স্থগিত হয়ে যায়। একই টিআইএনের আওতায় একাধিক ব্যক্তি ভোটার হওয়ার অভিযোগে আদালত নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। এরপরও বিরোধের অবসান হয়নি।

নতুন নিয়ম, নতুন বিতর্ক

চলতি বছরের এপ্রিলে নির্বাচন কমিশন নতুন তফসিল ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ভোটার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রযোজক যত চলচ্চিত্রই নির্মাণ করুন না কেন, তিনি একজন ভোটার হিসেবেই গণ্য হবেন। পাশাপাশি সদস্যপদ নবায়ন এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়। প্রথমে ১১ জুলাই ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হলেও পরে তা পিছিয়ে ৮ আগস্ট করা হয়।

মনোনয়ন বাতিল নিয়ে প্রশ্ন

নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকতেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে নির্বাচন ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সামসুল আলম ও খোরশেদ আলম খসরুর দাবি, তাদের ক্ষেত্রে এমন একটি বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে কার্যকর হয়েছে। তাদের ভাষ্য, যে বিধির কথা উল্লেখ করে মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, তা অতীতের নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি তারা আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছেন। খোরশেদ আলম খসরুর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মামলার কারণে সমিতির নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে চলচ্চিত্র শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন। অন্যদিকে সামসুল আলম বলেন, ২০১৯ সালের নির্বাচন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই নির্বাচন বাতিলের সিদ্ধান্তের দায় প্রার্থীদের ওপর বর্তায় না বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে খসরু-আলমের মনোনয়নপত্র বাতিলের পেছনে হাত রয়েছে বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে অভিযোগ করেছন। তবে এ বিষয়টিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন চিত্রনায়ক ও প্রযোজক আশরাফ উদ্দিন উজ্জ্বল। তিনি বলেন, ‘এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। সবকিছুরই একটা প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির নির্বাচনও একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যথাসময়েই হবে। যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে তারা তাদের মতো করে সমাধান করবে। এখানে আমার মন্তব্য করার কিছু নেই। আমরা কেবল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ এই সংগঠনকে কার্যকর করার চেষ্টা করছি।’

বিতর্কের কেন্দ্রে গঠনতন্ত্র

গঠনতন্ত্রের একটি ধারাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান জটিলতার সূত্রপাত বলে দাবি করেছেন সমিতির একাধিক সদস্য। তাদের ভাষ্য, সমিতির গঠনতন্ত্রে টানা দুই মেয়াদ কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে তৃতীয়বার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকার বিধান ছিল। তবে ২০২৩ সালে প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে ওই বিধান বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একই সময়ে ২০১৯-২০২১ মেয়াদের নির্বাচনও বাতিল হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ওই মেয়াদে কে নির্বাচিত ছিলেন, তা পরবর্তী নির্বাচনে যোগ্যতা নির্ধারণে বিবেচনায় আসবে না– এমন ব্যাখ্যাই কার্যকর ছিল বলে দাবি তাদের।

সমিতির সদস্যদের দাবি, ওই সিদ্ধান্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেই নেওয়া হয়েছিল এবং কয়েকজন সদস্যের মতামতের ভিত্তিতেই প্রশাসক প্রজ্ঞাপন জারি করেন। কিন্তু ২০২৫ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন প্রজ্ঞাপনে আবারও গঠনতন্ত্রের আগের বিধান কার্যকর করা হয়, যেখানে টানা দুই মেয়াদ কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বা নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে তৃতীয়বার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলে উল্লেখ করা হয়। এই পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সমিতির সদস্য ও প্রযোজক আরশাদ আদনানের সঙ্গে। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েও পরে নায়ক ও প্রযোজক উজ্জলের সম্মানে সরে দাঁড়ানো এই প্রযোজক বলেন, ২০২৩ সালের প্রজ্ঞাপন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসকই জারি করেছিলেন এবং সে সময় পরপর দুই মেয়াদের বিধান কার্যকর না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণেও ওই প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে ২০১৯-২০২১ মেয়াদকে নির্বাচন-যোগ্যতার ক্ষেত্রে কীভাবে বিবেচনা করা হবে, সেটিই এখন আইনি ব্যাখ্যার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান প্রার্থীরা চাইলে এই বিষয়গুলো তুলে ধরে উচ্চ আদালতে আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।


 

আরও পড়ুন

×