ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

দিল্লিগামী ফ্লাইট থেকে ইরানে মোসাদ এজেন্ট, এরপর রুদ্ধশ্বাস অভিযান

রিভিউ: তেহরান

দিল্লিগামী ফ্লাইট থেকে ইরানে মোসাদ এজেন্ট, এরপর রুদ্ধশ্বাস অভিযান
×

ওয়েব সিরিজ তেহরানে অভিনয় করেছেন নিভ সুলতান ও গ্লেন ক্লোজ। ছবি: সংগৃহীত

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৫১ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:২২

জর্ডানের রাজধানী আম্মান বিমানবন্দরের দৃশ্য। বোরকা পরা এক যাত্রী উঠলেন ভারতের নয়াদিল্লিগামী ফ্লাইটে। পাশের আসনে তাঁর পুরুষ সঙ্গী। যাত্রা শুরুর পর মাঝ আকাশে উড়োজাহাজে হঠাৎ ঝাঁকুনি শুরু। ক্যাপ্টেন ঘোষণা দিলেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তারা ইরানের রাজধানী তেহরানে জরুরি অবতরণ করবেন। 

বিমানবন্দরে নেমে যাত্রীদের উড়োজাহাজ বদলের সময় বোরকা পরা ওই নারী হঠাৎ শৌচাগারে প্রবেশ করেন। সেখানে তাঁর মতো দেখতে আরেক নারী (বিমানবালার পোশাকে) আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। পোশাক বদলের পর তাদের একজন বিমানবন্দরের বাইরে চলে যান। তাঁর নাম তামার রাবিনিয়ান (নিভ সুলতান)। যিনি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একজন এজেন্ট।

বিমানবালার ছদ্মবেশে ইরানে প্রবেশ করেন মোসাদ এজেন্ট তামার রাবিনিয়ান। ছবি: সংগৃহীত

পরের দৃশ্যগুলোতে জানা যায়, ইরানে এজেন্ট পাঠানোর কৌশল হিসেবে মোসাদ উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জরুরি অবতরণের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। তামার দ্বিতীয় যে নারীর ছদ্মবেশে ইরানে প্রবেশ করেন, তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থার কর্মী, নাম- জিহলা। মোসাদের সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। ঘটনাক্রমে বিমানবন্দরে নিয়োজিত শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ফারাজ কামালি দেশে মোসাদ এজেন্ট ঢোকার তথ্য জানাতে পারেন। এরপর শুরু হয় মোসাদের পিছু নেওয়ার অভিযান।

মোসাদ ও ইরানি গোয়েন্দার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের গল্প দেখানো হয়েছে ‘তেহরান’ নামের ওয়েব সিরিজে। এর প্রথম সিজন মুক্তি পায় ২০২০ সালের জুনে। চলতি বছর তৃতীয় সিজন মুক্তি পেয়েছে। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কানের সহযোগিতায় নির্মিত এই স্পাই থ্রিলারের বিরুদ্ধে ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানোর অভিযোগ আছে। গুপ্তচরবৃত্তি ও অনুপ্রবেশের রোমাঞ্চকর গল্পের ভাঁজে ভাঁজে তুলে ধরা হয়েছে শাসনতন্ত্রবিরোধী ইরানিদের মানবিক দিক।

সিরিজটি মুক্তির পর ‍দুই ধরনের বয়ান সামনে আসে। সরকারপন্থীরা এটিকে ইরানবিরোধী প্রচারণা বলে অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে, তুলনামূলক উদারপন্থী ইরানিরাও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখান। তাদের অভিযোগ, সিরিজের গল্পে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতি দেখানো হয়েছে।

একটি দৃশ্যে ফারাজ কামালি ও তামার রাবিনিয়ান।

তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে সিরিজটি গুপ্তচরবৃত্তির গল্পকে পুরুষদের দখলের বাইরে নিয়ে এসেছে। গত কয়েক দশক ধরে এই ধাঁচের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে সবচেয়ে পরিচিত চরিত্রদের মধ্যে ছিলেন জেমস বন্ডের মতো স্পাই, কিংবা ব্রিটিশ লেখক জন ল্য কারের সৃষ্ট চরিত্ররা। গত কয়েক বছরে সেই ধারা বদলের কাতারে যুক্ত হয়েছে ‘তেহরান’।

সিরিজটির তিন সহ-নির্মাতাদের একজনও নারী। নাম- দানা এডেন। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে চতুর্থ সিজনের শুটিং চলার সময় গ্রিসের এথেন্সে হোটেল কক্ষ থেকে দানার মরদেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করেছে। 

একটি ভুল ও ২৪ এপিসোডের দৌড়
কেন্দ্রীয় চরিত্র তামারের লক্ষ্য ছিল ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিড অচল করে দেওয়া। কিন্তু শুরুতেই মোসাদের কাছে যাওয়া একটি ভুল তথ্যের কারণে সিরিজটি প্রতিকূল পরিবেশে তামারের টিকে থাকার গল্পে পরিণত হয়। তাতে উত্তেজনায় খুব একটা ভাটা পড়ে না। 

আট পর্ব করে তিন সিজনের প্রত্যেকটিই রোমাঞ্চে পরিপূর্ণ। প্রযুক্তিতে দক্ষ এজেন্ট তামারকে ধরতে পিছু নেন ফারাজ কামালি (শন টুব)। এ অবস্থায় ইসরায়েলে থাকা মোসাদের কর্মকর্তারা তামারকে ইরান থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা করতে থাকেন। 

তৃতীয় সিজনে তামারের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা ভণ্ডুল করে দেওয়া।

অন্যদিকে তামারও নিজের অবস্থান নিয়মিত বদলাতে শুরু করেন। ঘুরতে ঘুরতে তাঁর পরিচয় হয় নানা শ্রেণি-পেশার ইরানির সঙ্গে। যাদের মধ্যে আছেন- দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্য, মাদক ব্যবসায়ী, ভিন্নমতাবলম্বী, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ইরানি ইহুদি থেকে শুরু করে ইসরায়েলের হয়ে কাজ করা মুসলিম।

গল্পের নিয়ম মেনে, তামারের জীবনে একসময় প্রেমের ঝলক আসে। আর তখনই বাস্তবতা বিচ্যুতি ঘটে। প্রথম সিজনের একাধিক এপিসোডে তামারকে এমন আচরণ করতে দেখা যায়, যা মোসাদ এজেন্টের সঙ্গে কম মানানসই। দ্বিতীয় সিজনে তামারের লক্ষ্য ছিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধানকে হত্যা করা। এ কাজ করতে গিয়েও ত্রিমুখী প্রেমের সূত্রপাত হয়। 

সিরিজের অধিকাংশ দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে গ্রিসের এথেন্সে।

মোসাদ এজেন্ট ও আইআরজিসির ইঁদুর-বিড়াল দৌড়ে দ্বিতীয় সিজনের মাঝামাঝি পর্বগুলোতে মুখোমুখি হন তামার ও ফারাজ। সেখানে ফারাজের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আইআরজিসির ভেতরে প্রবেশ করে মোসাদ। তৃতীয় সিজনে তামারের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায়, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা ভণ্ডুল করে দেওয়া। আর ফারাজের কাজ হয়, চিহ্নিত শত্রুকে ধাওয়া করা।

দেখবেন কি না?
সিরিজটিকে মোটামুটি মানের স্পাই থ্রিলার বলা যায়। ইরানের গল্প হলেও অধিকাংশ দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে গ্রিসে। পরে কম্পিউটার নির্মিত দৃশ্য ব্যবহার করে সেটিকে তেহরানের মতো করে তোলা হয়েছে। তবে দেখার সময় তেমন একটা অসঙ্গতি চোখে পড়ে না। অভিনয়ের জায়গায় তামার, ফারাজ কিংবা পার্শ্বচরিত্ররা চমৎকারভাবে নিজেদের মেলে ধরেছেন।

তৃতীয় সিজনে অভিনয় করেছেন ‘দ্য নাইট ম্যানেজার’খ্যাত হিউ লরি।

সিরিজটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জটিল চরিত্র তামারের প্রতিপক্ষ ফারাজ কামালি। দেশের প্রতি নিষ্ঠার পাশাপাশি স্ত্রীর জন্যও কামালির আছে গভীর ভালোবাসা। কখনো নির্মম, কখনো কোমল- ফারাজ কামালি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি সব সময় রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না।

গল্পে ইরানিদেরকে খুব বেশি নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এমন নয়। বরং সাধারণ নাগরিক ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে এটিকে সব সময় ইরানবিরোধী কাজ বলে মনে হয় না।  

তবে ইঁদুর-বিড়াল দৌড়ের গুপ্তচরবৃত্তির কাহিনি ইদানিং অধিকাংশ সিরিজেই দেখা যায়। দিন শেষে তাই ভালো বা মন্দ লাগাটা নির্ভর করে গল্পের চমকের ওপর। সেই জায়গায় ‘তেহরান’ অনেকটাই সফল। এছাড়া, সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি ইরান-ইসরায়েলের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপট। যা বাড়তি আগ্রহের জন্ম দেয়। 

আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিজটি সম্প্রচার করছে অ্যাপল টিভি।

আরও পড়ুন

×