এশিয়াজুড়ে রেকর্ড তাপপ্রবাহ, মাটির নিচে ‘সেদ্ধ’ হচ্ছে আলু
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:১২
এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রেকর্ড তাপমাত্রার কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষকেরা ফসল হারাচ্ছেন। দেশটির একটি এলাকায় মাটির নিচে থাকা আলু অতিরিক্ত তাপে নষ্ট হয়ে অনেকটা ‘সেদ্ধ আলুর’ মতো হয়ে গেছে। একই সময়ে জাপানে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। হংকংয়ে রেকর্ড রাখা শুরুর পর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছে ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ইয়াংগু কাউন্টির একটি আলুখেতে সম্প্রতি এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন কৃষক লি সাং-হিয়ক। এক সপ্তাহ আগেও তার ক্ষেতের আলু ভালো ছিল। পরে মাটি খুঁড়ে দেখা যায়, আলুগুলো নরম হয়ে পচে গেছে। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে তিনি বলেন, ‘সেদ্ধ আলুর মতো’ হয়ে যাওয়া এসব আলু আর সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও হংকংয়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে গত ২ আগস্ট তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল। আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ শুরুর পর দেশটিতে এটিই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গরমে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা গেছে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে চাষ করা প্রায় ১৪ লাখ মাছ। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করে মানুষকে দ্রুত সব ধরনের বাইরের কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এই চরম আবহাওয়াকে ‘আগে কখনো দেখা যায়নি এমন’ পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, চরম আবহাওয়া যখন নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে, তখন জাতীয় সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
শুধু আলু নয়, তীব্র গরমে দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যান্য কৃষিপণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিউল থেকে প্রায় ২৫৭ কিলোমিটার দক্ষিণে গোয়াংজুর কৃষক হং কিয়ং-হির তরমুজও নষ্ট হয়ে গেছে। সাধারণত যে তরমুজ বেশি দামে বিক্রি হয়, সেগুলো কয়েক দিনের মধ্যে নরম হয়ে পচে গেছে। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম কেবিএসকে তিনি বলেন, ৫০ বছর ধরে কৃষিকাজ করলেও এমন ঘটনা তিনি আগে দেখেননি।

দক্ষিণ জেওলা প্রদেশের দামইয়াং কাউন্টির স্ট্রবেরিচাষি ইউন উ-হা তিন মাস ধরে পরিচর্যা করা চারাগাছ হারিয়েছেন। এসব ক্ষতির ক্ষেত্রে তার বীমার আওতায়ও কোনো সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষি বীমা ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ফসল, চাষপদ্ধতি ও অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত থাকায় অনেক কৃষকই জলবায়ুজনিত অস্বাভাবিক ক্ষতির ক্ষেত্রে সুরক্ষা পাচ্ছেন না।
জাপানেও এবার তাপপ্রবাহের তীব্রতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশটির একাধিক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়েছে। চলতি বছর দেশটির আবহাওয়া সংস্থা ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার জন্য ‘কোকুশোবি’ বা ‘নিষ্ঠুর গরমের দিন’ নামে নতুন একটি শ্রেণি চালু করেছে। টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোকে তিনটি সিংহের মৃত্যুও হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে এ ধরনের চরম তাপপ্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে। জাপানের ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন সেন্টারের গবেষকেরা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন না থাকলে জুলাইয়ে জাপানে দেখা দেওয়া এমন তীব্র তাপপ্রবাহ প্রায় অসম্ভব ছিল। তাদের হিসাব অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট উষ্ণায়ন ছাড়া এ মাত্রার তাপপ্রবাহ গড়ে ১০ হাজার বছরে একবার ঘটতে পারত।
হংকংয়েও তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে। টাইফুন ডলফিনের বাইরের অংশের প্রভাবে গরম বাতাস শহরটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ১৮৮৪ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর এটিই হংকংয়ের সর্বোচ্চ সরকারি তাপমাত্রা।
চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াংয়ে জুলাইয়ে একটি আবহাওয়া স্টেশনে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়েও একের পর এক উষ্ণ রাতের ঘটনা ঘটেছে; রাতে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি।
পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ুবিজ্ঞানী জুন-ই লির মতে, বায়ুমণ্ডলীয় বিভিন্ন প্রবাহ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্মিলিত প্রভাবে এ অঞ্চলে তাপপ্রবাহের এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তার ভাষ্য, তিব্বত মালভূমি ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় এবং এ বছরের এল নিনোর প্রভাব তাপপ্রবাহ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সর্বশেষ ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এশিয়ায় উষ্ণায়নের গতি তার আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
জলবায়ুবিজ্ঞানী জুন-ই লি সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ও তীব্র হবে। একই সঙ্গে পরপর তাপপ্রবাহ এবং ভারী বৃষ্টির মতো একাধিক চরম আবহাওয়ার ঘটনা একসঙ্গে ঘটার প্রবণতাও বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত ও বড় মাত্রায় কমানোর পাশাপাশি ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা জরুরি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান