বিষক্রিয়ায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যু
নিহত প্রত্যেকের পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা, তদন্তে কমিটি
আট বছরে ১৪৬ শ্রমিকের মৃত্যু: ইপসা
নিহতের স্বজনদের আহাজারি। ছবি: সমকাল
এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৪৯
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস ছড়িয়ে অন্তত ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। শুক্রবার সকাল ৯ টার দিকে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রথম দিকে চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ি, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নিহতরা হলেন- সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মোহাম্মদ মনসুর আলী (৫৫), মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন (৫১), পাবনার সুজানগরের আব্দুল আলীম সুজন (৩৬), গাইবান্ধার রানা মিয়া (২৩), সীতাকুণ্ডের হাবিবুর রহমান (৫১), পলাশ দাশ (৩৫), সানি দাশ (২৩), গাইবান্ধার খোকন মিয়া (২৩)। শরীফ নামের আরেক শ্রমিক চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন চমেক পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন।
ট্যাংক থেকে গ্যাস ছড়িয়ে দুর্ঘটনা
ফেরদৌস স্টিল শিপ ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। তবে স্ক্র্যাপ জাহাজের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা জাহাজের বিভিন্ন বিষয় দেখাশোনা করছিলেন। সকাল ৯ টার দিকে একটি জাহাজের ট্যাংকে গ্যাসের লিকেজ হয়।
ইয়ার্ড ব্যবস্থাপকের ভাষ্য, গ্যাস লিকেজের খবর পেয়ে স্থানীয় কিছু লোক ঘটনাটি দেখতে জাহাজের কাছে যান। সেখানে জমে থাকা গ্যাসে কয়েকজন হতাহত হন। তবে ঘটনার সময় হতাহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা তিনি জানাতে পারেননি।
কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ আল মামুন বলেন, শিপইয়ার্ডে মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছিল।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ তাকে আটজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত না করা পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

তদন্ত কমিটি, পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)। কমিটির প্রধান করা হয়েছে ক্যাপ্টেন মো. এনামকে। এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
বিএসবিআরএর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, জাহাজে নেভিগেশনসহ বিভিন্ন বিষয় থাকায় সেনাবাহিনীর একটি দলও ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করবে। দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইয়ার্ডের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, আহত ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতাও করা হবে।
আট বছরে ১৪৬ শ্রমিকের মৃত্যু
জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসা। সংস্থাটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, গত দুই বছরে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আর গত আট বছরে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪৬ জন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থাকা গ্যাস ও বিপজ্জনক পদার্থ পরীক্ষা করে নিরাপদ ঘোষণা করা গুরুত্বপূর্ণ। জাহাজে অ্যাসবেস্টস, পিসিবি, তেল, ভারী ধাতু ও ওজোন-ক্ষয়কারী গ্যাসসহ বিপজ্জনক উপাদান কোথায় রয়েছে, তার তালিকা পর্যালোচনা করে সেগুলো অপসারণের কথা।
অনুমোদিত মেরিন সার্ভেয়ার বা বিশেষজ্ঞের পরীক্ষায় ট্যাংকে দাহ্য গ্যাস নেই- এমন নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাটিং করার নিয়ম। এ ছাড়া জাহাজে থাকা ফুয়েল, লুব অয়েল, স্লাজ ও বিলজ ওয়াটারের মতো দূষণকারী পদার্থও অপসারণ করার কথা।
পরিবেশ অধিদপ্তর সরাসরি এসব পদার্থ পরিষ্কারের কাজ করে না। তবে ইয়ার্ডের পরিবেশগত ছাড়পত্র, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ আইন মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা তদারক করার দায়িত্ব সংস্থাটির।
দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরও কীভাবে এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে গ্যাস জমে ছিল। এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইয়ার্ডে ভাঙচুর, লুটপাট
এদিকে দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা ইয়ার্ডে গিয়ে ভাঙচুর করেছেন বলে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এ সময় ইয়ার্ডের বিভিন্ন মালামালও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিকেল তিনটার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
একই এলাকার চারজনের মৃত্যু
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে চারজন সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে মনসুর আলী ও নাছির উদ্দীন আপন ভাই। তাদের বাবা মো. সেকান্দর। পলাশ দাশ ও সানি দাশও একই এলাকার জেলেপাড়ার বাসিন্দা।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সায়েদ বলেন, মনসুর ও নাছির খুবই দরিদ্র পরিবারের সদস্য ছিলেন। তারা নিয়মিত শিপইয়ার্ডে কাজ করতেন। দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে পরিবারটি আরও অসহায় হয়ে পড়েছে। একই এলাকার পলাশ ও সানির মৃত্যুতে তাদের পরিবারেও নেমে এসেছে শোক ও অনিশ্চয়তা।
- বিষয় :
- সীতাকুণ্ড
- বিষক্রিয়া
- শ্রমিক নিহত
- চট্টগ্রাম
- জাহাজ