২ সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বৃদ্ধ বাবা, নাতনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চায়তা
মনসুরের মৃত্যুর খবর শুনে কাঁদছিলেন তার দুই মেয়ে। বাবা ও চাচাকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তারা। ছবি: মো. রাশেদ
এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:২৮ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:২৯
বৃহস্পতিবার দুপুরেও দুই ছেলেকে নিয়ে একসঙ্গে ভাত খেয়েছিলেন সেকান্দার আলী। তখন কে জানত, সেটিই হবে দুই সন্তানের সঙ্গে তার শেষবারের মতো একসঙ্গে খাওয়া। এক দিনের ব্যবধানে দুই ছেলের নিথর দেহ এখন লাশকাটা ঘরে। তাদের হারিয়ে বাকরুদ্ধ বৃদ্ধ বাবা। চোখে পানি, মুখে শোকের ছাপ। পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন নাতনিরাও।
শুক্রবার সকালে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী সমুদ্র উপকূলে ফেরদৌস স্টিল গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের একটি এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিষক্রিয়ায় নয়জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও কয়েকজন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সেকান্দার আলীর দুই ছেলে মোহাম্মদ মনসুর আলী ও মোহাম্মদ নাসিরও রয়েছেন।
দুই ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে নির্বাক সেকান্দার। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। দাদার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন মনসুরের দুই মেয়ে ও নাসিরের এক মেয়ে। বাবাদের হারিয়ে তাদের চোখেমুখেও এখন অনিশ্চয়তা।
কাঁদতে কাঁদতে সেকান্দার আলী বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ১৭ বছর ধরে এই শিপইয়ার্ডে কাজ করত। এত বছর কাজ করার পর আজ দুজনকেই হারালাম। আমার সন্তানদের আর ফিরে পাব না। এখন আমার নাতনিদের কী হবে, সেই চিন্তাই করছি। কর্তৃপক্ষের গাফিলাতির কারণে মারা গেল তারা। ঘটনার পর আক্রান্ত শ্রমিকরা যদি সুচিকিৎসা পেত তাহলে আজ তাদের প্রাণ দিতে হতো না।’
মনসুর আলীর বড় মেয়ে রুপা আক্তার বলেন, ‘শুক্রবারও বাবাকে জোর করে কাজে নিয়ে যাওয়া হয়। দুর্ঘটনার পর আহতদের প্রায় দুই ঘণ্টা ইয়ার্ডের ভেতরে রাখা হয়েছিল। তখন যদি দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হতো, হয়তো অনেকে বেঁচে যেতেন। ইয়ার্ডের ভেতরে অক্সিজেনও ছিল না।’

বাবাকে হারিয়ে এখন তাদের পরিবারের কী হবে, সেটিও জানেন না রুপা। তিনি বলেন, ‘আমরা তিন বোন। আমাদের কোনো ভাই নেই। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বাবা। এখন আমরা কীভাবে চলব, বুঝতে পারছি না।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সায়েদ বলেন, মনসুর ও নাসির দুই ভাইই এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তারা মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতেন। দুই ভাইয়ের একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক নেমে এসেছে।
ফেরদৌস স্টিল গ্রিন শিপইয়ার্ডের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। নিহতদের পরিবারকে সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রোকার্স অ্যান্ড রিসাইকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। আহত ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে শিপ রিসাইক্লিং বিষয়ে অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ এনামকে।
তবে ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহায়তার আশ্বাসের মধ্যেও সেকান্দার আলীর পরিবারের শোক কাটছে না। দুই ছেলের মুখ আর কখনো দেখতে পারবেন না তিনি। আর তার নাতনিদের সামনে এখন বাবাকে হারানোর শোকের সঙ্গে যোগ হয়েছে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
- বিষয় :
- সীতাকুণ্ড
- শিপইয়ার্ড
- জাহাজ ভাঙা শিল্প