মানবসম্পদ
সহমর্মী শিক্ষকই মাধ্যমিক রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি
শিক্ষা কেবল তথ্য স্থানান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি মানবিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রূপান্তরমূলক যাত্রা। ছবি: এআই
মো. আসিরুল হক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ২০:০১
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৮ সাল থেকে ধাপে ধাপে যে সংশোধিত শিক্ষাক্রম চালু হওয়ার কথা, তা কেবল পাঠ্যবই বদলের পরিকল্পনা নয়– এটি শিক্ষাদর্শন বদলের ঘোষণা। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, অভিজ্ঞতানির্ভর শিখন, সমালোচনামূলক চিন্তা, সহযোগিতা, মূল্যায়নের নতুন কাঠামো– সব মিলিয়ে এটি নিঃসন্দেহে এক উচ্চাভিলাষী রূপান্তর। কিন্তু আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বলে, শিক্ষাক্রম প্রণয়ন বা সংস্কার যতটা সহজ, বাস্তবায়ন ততটাই জটিল। নীতিপত্রে লেখা দর্শন যদি শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতায় প্রাণ না পায়, তবে তা কেবল একটি প্রশাসনিক দলিল হয়েই থেকে যায়। আর সেই প্রাণ সঞ্চারের কেন্দ্রে থাকেন একজন মানুষ– শিক্ষক।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত অবকাঠামো নয়, বরং মানসিক দূরত্ব। বহু বিদ্যালয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে। শিক্ষক পাঠদান করেন, শিক্ষার্থী শোনে; শিক্ষক প্রশ্ন করেন, শিক্ষার্থী উত্তর দেয়, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে হৃদয়ের কোনো সংযোগ তৈরি হয় না। অথচ শিক্ষা কেবল তথ্য স্থানান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি মানবিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রূপান্তরমূলক যাত্রা। একজন শিক্ষার্থী যখন বলে, ‘স্যার, আমাকে বুঝুন’– সেই আহ্বান কেবল পাঠ বোঝার নয়, নিজেকে বোঝানোর আকুতি। এই জায়গাটিই আমাদের নতুন শিক্ষাক্রমের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রকৃত পরীক্ষাক্ষেত্র।
বাস্তবায়নের ফারাক: নথির সৌন্দর্য বনাম রূঢ় বাস্তবতা
নতুন শিক্ষাক্রমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করা, শুধু পরীক্ষার জন্য নয়। সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ, নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এসব গুণাবলি বই পড়ে অর্জন করা যায় না; এগুলো গড়ে ওঠে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। কিন্তু বাস্তবতায় একজন শিক্ষক যখন ৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ৪০ মিনিটের ক্লাসে প্রবেশ করেন, তখন তার সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হয় সময় ব্যবস্থাপনা। প্রশাসনিক কাজ, পরীক্ষা প্রস্তুতি, অভিভাবকের প্রত্যাশা সব মিলিয়ে তিনি নিরাপদ পথ বেছে নেন– লেকচার ও নোটভিত্তিক পাঠদান। ফলে শিক্ষাক্রমের আদর্শ ও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার মাঝে তৈরি হয় গভীর শূন্যতা। এই শূন্যতা পূরণ করতে প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন সম্পর্কের পুনর্গঠন।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ: তাত্ত্বিক জ্ঞান থেকে প্রায়োগিক রূপান্তর
দেশে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য ‘প্রি-সার্ভিস ট্রেনিং’ বা চাকরিতে যোগদানের আগে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক নয়। অনেকের বিএড ডিগ্রি থাকলেও তার অনেকটা তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতায় বন্দি। নায়েম কিংবা টিটিসি থেকে পাওয়া ৫-১০ দিনের সংক্ষিপ্ত কর্মশালা নিয়ে শিক্ষকরা যখন ক্লাসে ফেরেন, তাদের আক্ষেপ একটাই ‘প্রশিক্ষণে অনেক কিছু শুনি, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে তা প্রয়োগ করার সুযোগ পাই না।’
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অভিভাবকদের সামাজিক চাপ এবং শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণশৈলী বা পেডাগজিক্যাল দক্ষতার ঘাটতি। গ্রামবাংলার চিত্র আরও করুণ; প্রায় ৭০ শতাংশ স্কুলেই বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের স্থিতিশীল সংযোগ নেই। যেখানে একটি শ্রেণিকক্ষে গড়ে ৫৫ থেকে ৬৫ জন শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসে, সেখানে একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রশাসনিক কাজ ও পরীক্ষার চাপ সামলে প্রতিদিন ৬-৭টি ক্লাস সামলানো রীতিমতো যুদ্ধ জয়ের সমান। ফলে আধুনিক শিক্ষণশৈলীর শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান, ধারাবাহিক মূল্যায়ন কিংবা বৈচিত্র্যময় মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত চাহিদা বোঝার মতো অতিপ্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো কেবল কাগুজে বুলি হিসেবেই থেকে যায়। আমাদের বুঝতে হবে, পেডাগজি বা শিক্ষণবিজ্ঞান কেবল পড়ানোর কিছু যান্ত্রিক কৌশল নয়; এটি হলো শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব বোঝা, তাদের ভিন্নতাকে গ্রহণ করা এবং সবচেয়ে বড় কথা– তাদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা পোষণ করা।
২০২২ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে প্রশিক্ষণ যদি পর্যাপ্ত এবং মানসম্মত না হয়, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রগতিশীল ও আধুনিক কারিকুলামও শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মাঝেই মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই স্বপ্ন যদি হয় বৈশ্বিক মানের শিক্ষা, তবে আগে প্রয়োজন কাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের মনস্তাত্ত্বিক ও কারিগরি উন্নয়ন।
সহমর্মিতার শক্তি: যেখানে ভয় নয়, ভালোবাসাই শিক্ষার চালিকাশক্তি
সহমর্মিতা মানে কেবল নিচু স্বরে কথা বলা নয়; বরং তা হলো শিক্ষার্থীর চোখের দিকে তাকিয়ে এই অভয় দেওয়া যে ‘আমি তোমাকে বুঝি, তোমার সমস্যা আমারও।’ পরম মমতায় জানতে চাওয়া ‘আজ তোমার মন খারাপ কেন? বাড়িতে কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলো, আমি তোমার পাশে আছি।’ এটাই প্রকৃত শিক্ষকতা।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিছক পুঁথিগত সম্পর্কের বাইরে একটি মানবিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন, তাদের শ্রেণিকক্ষে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে চোখে পড়ার মতো। এমন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার কমে, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাড়ে এবং পরীক্ষার ফলাফলও লক্ষণীয়ভাবে উন্নত হয়। পরিসংখ্যন বলছে, সহমর্মিতাশীল শিক্ষকের সান্নিধ্যে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এর মূল কারণ হলো শিক্ষার্থীরা সেখানে নিজেকে ‘নিরাপদ’ মনে করে; তারা ভুল করতে ভয় পায় না। শিক্ষকের ছোট ছোট সহানুভূতিশীল আচরণ শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান বাড়িয়ে দেয়, ঝরে পড়ার হার কমায় এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে এখনও অনেক শিক্ষক ‘শাসন আর ভয়’ প্রদর্শনকেই শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম মনে করেন। ‘চুপ করে থাকো, না হলে বেঞ্চের নিচে বসিয়ে রাখব!’ এমন শাসনে, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা লজ্জায় আর সংকোচে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। অথচ সহমর্মিতাশীল একজন শিক্ষক বলতেন, ‘তোমার মতামতটা আমি জানতে চাই। ভুল হলে কোনো সমস্যা নেই, আমরা সবাই মিলেই শিখছি।’
এই মানবিক শিক্ষার একটি অনন্য উদাহরণ হতে পারে লাইট অব হোপ ও ইউএনএইচসিআর এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘ক্যাম্পেইন ফর এমপ্যাথি অ্যান্ড পিস’। ২০২২ সাল থেকে ঢাকা ও কক্সবাজারের ৩০টি স্কুলে এই কার্যক্রমটি চলছে। তাদের প্রকাশিত বই ‘আমার বন্ধু আমেনা’, যেখানে একজন রোহিঙ্গা কিশোরী ও একজন বাংলাদেশি কিশোরের বন্ধুত্বের গল্প বলা হয়েছে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, এই গল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি মানবিকতা ও সহানুভূতির এক নতুন দুয়ার খুলে গেছে।
শিক্ষকের সুস্থতা: মানবিক কাঠামোর ভিত্তি
তবে একটি রূঢ় বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই– শিক্ষক নিজেও একজন মানুষ। অতিরিক্ত কাজের চাপ, জীবনযাত্রার তুলনায় অপ্রতুল বেতন এবং সমাজ থেকে প্রাপ্য মর্যাদার অভাব তাদের অনেক সময় মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। তাই শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রশিক্ষণের মডিউলে তাদের মানসিক প্রশান্তির বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রতিটি স্কুলে ‘মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম’ চালু করা প্রয়োজন, যেখানে অভিজ্ঞ ও সংবেদনশীল শিক্ষকরা নতুন শিক্ষকদের শেখাবেন– কীভাবে কেবল মগজ নয়, শিক্ষার্থীর হৃদয়ের সঙ্গেও গভীর সংযোগ স্থাপন করতে হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা: সহমর্মিতার আলোয় পাকিস্তান ও ভারত
শিক্ষায় সহমর্মিতা কেবল একটি আবেগ নয়, বরং এটি একটি কার্যকর হাতিয়ার। ইউনেস্কোর ‘লার্নিং ফর এমপ্যাথি’ (২০১৯-২০২২) প্রকল্পটি বাংলাদেশসহ পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও জাপানে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। পাকিস্তানে ইতিহাসের ক্লাসগুলোতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মতো সংবেদনশীল বিষয় শেখানোর সময় শিক্ষকরা এখন ‘রোল-প্লে’ বা নাটিকা এবং জীবনমুখী গল্পের সাহায্য নেন। এতে শিক্ষার্থীরা কেবল একপাক্ষিক ইতিহাস নয়, বরং অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে শিখেছে, যা তাদের মধ্যে সামাজিক সহনশীলতা বাড়িয়েছে।
অনুরূপভাবে, ভারতে ‘এনফোল্ড ইন্ডিয়া’র ‘রেস্টোরেটিভ জাস্টিস’ বা ‘পুনরুদ্ধারমূলক বিচার’ কর্মসূচি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সেখানে কোনো ভুলের জন্য শিক্ষার্থীকে গতানুগতিক শাস্তি না দিয়ে ‘পিস সার্কেল’ বা ‘শান্তি বলয়’ এর মাধ্যমে বিবাদ মিটিয়ে ফেলা হয়। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বলছে, ‘এখন আমরা একে অপরকে অভিযুক্ত করার বদলে বুঝতে চেষ্টা করি।’ এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, শিক্ষকরা যদি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন, তবে শ্রেণিকক্ষেই সহমর্মিতা শেখানো সম্ভব।
উত্তরণের পথ: একবিংশ শতাব্দীর কার্যকর সমাধান
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এই রূপান্তরকে বাস্তব রূপ দিতে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
১. শিক্ষক প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন: শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে ৬ থেকে ১২ মাস মেয়াদি এবং সম্পূর্ণ বাস্তবমুখী করতে হবে। এতে তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে শ্রেণিকক্ষে হাতে-কলমে অনুশীলন, অভিজ্ঞ মেন্টরদের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা এবং নিয়মিত ‘রিফ্লেকশন’ বা পর্যালোচনার ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষণবিজ্ঞানের মডিউলে শিক্ষার্থীর প্রতি সহমর্মিতা এবং ট্রমা-সেনসিটিভ টিচিং (মানসিক আঘাত বা প্রতিকূলতা বুঝে পড়ানো) বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
২. নিরবচ্ছিন্ন পেশাগত উন্নয়ন : শিক্ষকদের জন্য বছরে অন্তত ৪০ ঘণ্টার পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এটি অনলাইন ও অফলাইন– উভয় মাধ্যমেই হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘মুক্তপাঠ’কে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে।
৩. মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা: শিক্ষকরা যাতে প্রফুল্ল মনে পাঠদান করতে পারেন, সেজন্য তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত কাউন্সেলিং সেন্টার স্থাপন এবং নিয়মিত স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট বা মানসিক চাপ কমানোর কর্মশালার আয়োজন করতে হবে।
৪. সহমর্মিতাশীল শিক্ষক স্বীকৃতি: যেসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষভাবে যত্নশীল ও সহমর্মী, তাদের কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। এই ‘সহমর্মিতাশীল শিক্ষক’ পুরস্কার বা স্বীকৃতিকে বিশেষ বোনাস, সম্মাননা সনদ এবং পদোন্নতির মানদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত।
৫. অংশগ্রহণমূলক মনিটরিং: শিক্ষকদের মূল্যায়ন কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হাতে না রেখে, সেখানে শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক এবং সহকর্মী শিক্ষকদের মতামতের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
৬. অভিভাবক কর্মশালা: শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের সঠিক বিকাশে অভিভাবকদের সচেতন করতে নিয়মিত ওয়ার্কশপ বা কর্মশালার আয়োজন করতে হবে, যাতে বাড়ি এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশে সামঞ্জস্য থাকে।
৭. ‘লার্নিং ফর এমপ্যাথি’ প্রকল্পের জাতীয় বিস্তার: সহমর্মিতার মাধ্যমে শিক্ষা অর্জনের যে সফল মডেল বা প্রকল্পগুলো বর্তমানে চালু আছে, সেগুলোকে জাতীয় শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।
৮. আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা বিনিময়: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষক বিনিময় কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। এতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর উন্নত শিক্ষাদান পদ্ধতি ও উদ্ভাবনী আইডিয়া সম্পর্কে আমাদের শিক্ষকরা সম্যক ধারণা পাবেন।
শিক্ষার এই রূপান্তর কেবল তখনই সফল হবে যখন কারিকুলামের শব্দের চেয়ে শিক্ষকের সংবেদনশীলতা বেশি গুরুত্ব পাবে।
শিক্ষকই পরিবর্তনের আসল কারিগর
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন শিক্ষার বিস্তার সবই শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। কিন্তু প্রযুক্তি কখনও সহমর্মিতা প্রতিস্থাপন করতে পারে না। একটি সফটওয়্যার উত্তর দিতে পারে, কিন্তু অনুভব করতে পারে না। একজন শিক্ষকই পারেন শিক্ষার্থীর চোখের অশ্রু দেখতে, কণ্ঠের কম্পন বুঝতে, নীরবতার ভাষা শুনতে। ভবিষ্যতের নাগরিক গড়ে তোলার জন্য প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক সংবেদনশীলতা অপরিহার্য। আর সেই মানবিকতার প্রথম পাঠ শুরু হয় শ্রেণিকক্ষে।
বাংলাদেশের নতুন সংশোধিত মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম সফল হবে কিনা, তা নির্ভর করবে কেবল নীতিমালার ওপর নয়, বরং শিক্ষকের হৃদয়ের ওপর। যদি শিক্ষক নিজেকে কেবল পাঠদাতা নয়, পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখেন– যদি তিনি শিক্ষার্থীর প্রতি সহমর্মিতা চর্চা করেন– তবে শিক্ষাক্রম প্রাণ পাবে। আর যদি সম্পর্কের এই ভিত্তি দুর্বল থাকে, তবে সবচেয়ে আধুনিক নীতিও কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।
একদিন হয়তো কোনো শিক্ষার্থী বলবে, ‘স্যার আমাকে শুধু পড়াননি, আমাকে বুঝেছেন।’ সেই বাক্যটিই হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। কারণ শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন জ্ঞান ও মানবিকতা একই সঙ্গে বিকশিত হয়। সহমর্মী শিক্ষকই সেই সেতু, যিনি ভবিষ্যতের দিকে পথ দেখান– শুধু মেধাবী নয়, মানবিক এক প্রজন্ম গড়ে তোলার মাধ্যমে।
ড. মো. আসিরুল হক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, এমসি কলেজ, সিলেট
[email protected]
- বিষয় :
- শিক্ষক
- শিক্ষাব্যবস্থা
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান