সমকালীন প্রসঙ্গ
চীন, ভারত এবং বাংলাদেশের এনবিআর
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৩৯
একসময় প্রায় সমান জনসংখ্যার দেশ ছিল একই মহাদেশের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী চীন এবং ভারত। কিন্তু অর্থনৈতিক ফলাফলে আজ যেন দুই ভিন্ন পৃথিবী। ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৪৮ কোটি, চীনের প্রায় ১৪০ কোটি। অর্থাৎ চীনের চেয়ে ভারতে প্রায় আট কোটি মানুষ বেশি। কিন্তু চলতি মূল্যে মার্কিন ডলারের হিসাবে চীনের জিডিপি প্রায় ২০.৮৫ ট্রিলিয়ন ডলার, আর ভারতের মাত্র ৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। জনসংখ্যায় কম হয়েও চীনের অর্থনীতি ভারতের পাঁচ গুণেরও বেশি।
মাথাপিছু জিডিপির ব্যবধান আরও বিস্ময়কর। ২০২৬ সালে চীনের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৪ হাজার ৮৭০ ডলার; পক্ষান্তরে ভারতের মাত্র দুই হাজার ৮১০ ডলার। অর্থাৎ মাথাপিছু অর্থনৈতিক উৎপাদনের এ সূচকেও চীন ভারতের পাঁচ গুণের বেশি এগিয়ে। এত বড় জনসংখ্যা, বিশাল বাজার ও বিপুল মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও ভারতের এই ব্যাপক পিছিয়ে থাকা এবং চীনের অসাধারণ উত্থান স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে আনে– কীভাবে সৃষ্টি হলো এই বিশাল ব্যবধান?
১৯৫২ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ভারত চীনের চেয়ে বড় অর্থনীতি ছিল। ১৯৮০ সালেও দুই দেশের অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় সমান। কিন্তু ১৯৮১ সালে চীন ভারতকে অতিক্রম করে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। যে দুই দেশ একসময় অর্থনৈতিকভাবে প্রায় পাশাপাশি ছিল, কয়েক দশকের ব্যবধানে তাদের একটির অর্থনীতি অন্যটির পাঁচ গুণেরও বেশি হয়ে গেছে।
এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর সূচনা খুঁজতে হয় ১৯৭৮ সালে দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে শুরু হওয়া চীনের সংস্কারযাত্রায়। কৃষিতে উৎপাদনের প্রণোদনা, গ্রামীণ শিল্পের বিকাশ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করা, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযোগ– এসব ছিল চীনের উত্থানের দৃশ্যমান দিক। কিন্তু এসব নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের পেছনে অন্যতম বড় শক্তি ছিল রাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও ক্যাডার ব্যবস্থায় শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞতাকে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দেওয়া।
দেং শিয়াওপিং বুঝেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল সাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না। বিদ্যুৎ, শিল্প, প্রযুক্তি, বন্দর, অর্থনীতি, রাজস্ব বা আর্থিক খাত– প্রতিটি ক্ষেত্রের নিজস্ব জটিলতা আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষা, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান। ফলে চীনের নেতৃত্ব নির্বাচনে তরুণ, শিক্ষিত, পেশাগতভাবে দক্ষ এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তাদের গুরুত্ব ক্রমে বাড়তে থাকে।
এখানেই জেনারেলিস্ট ও স্পেশালিস্ট ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য।
একজন জেনারেলিস্ট প্রশাসক দপ্তর সমন্বয় করতে পারেন, বিধিবিধান প্রয়োগ করতে পারেন এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন। কিন্তু একজন কর্মকর্তা আজ বিদ্যুৎ, কাল স্বাস্থ্য, পরশু শিল্প এবং তার পরদিন রাজস্ব বিভাগের নেতৃত্ব দিলে বিভিন্ন বিষয়ে কিছু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও কোনো একটি বিশেষায়িত খাতের গভীর জ্ঞান, দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি ও পেশাগত অন্তর্দৃষ্টি অর্জনের সুযোগ সীমিত থাকে। ফলে সিদ্ধান্তে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট খাতের বাস্তব জটিলতার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে না।
অন্যদিকে একজন বিশেষজ্ঞ বছরের পর বছর একই খাতে কাজ করতে করতে সেই খাতের আইন, কাঠামো, সমস্যা, সম্ভাবনা, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। ফলে তাঁর সিদ্ধান্তে সাধারণ ধারণার পরিবর্তে অভিজ্ঞতা এবং অনুমানের পরিবর্তে বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটে।
চীনের সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এখানেই। দেশটি শুধু নীতি পরিবর্তন করেনি; নীতি বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের সক্ষমতা, পেশাগত যোগ্যতা এবং ফলাফলভিত্তিক নেতৃত্বকেও গুরুত্ব দিয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে আমলাতন্ত্র শুধু ফাইল, অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সক্রিয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
ভারতের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় দেশটি লাইসেন্স-রাজ, আমলাতান্ত্রিক অনুমোদন, উচ্চ শুল্ক, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পনীতি এবং জেনারেলিস্ট প্রশাসননির্ভর সিদ্ধান্ত কাঠামোয় আবদ্ধ ছিল। ১৯৯১ সালের পর বড় অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হলেও তত দিনে চীন সংস্কারের পথে এক যুগেরও বেশি এগিয়ে গেছে এবং দ্রুত বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে।
ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস তথা আইএএসের ব্যাপক প্রাধান্য। পরবর্তী সময়ে ভারতের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সরকারি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা, কর্মকর্তাদের ঘন ঘন এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি কমানো এবং নির্দিষ্ট খাতে বিশেষায়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়েছে। এ স্বীকারোক্তিই সমস্যাটিকে স্পষ্ট করে। যে সময়ে চীন শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা ও সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে আধুনিক অর্থনীতির উপযোগী করে তুলছিল; ভারত তখনও দীর্ঘদিন জেনারেলিস্ট আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভার বহন করেছে।
চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক যাত্রা বিশ্বকে একটি শক্তিশালী শিক্ষা দেয়– বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানকে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে আধুনিক অর্থনীতির জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন।
বাংলাদেশের জন্য এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোনো সাধারণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়। আয়কর, ভ্যাট, কাস্টমস, আন্তর্জাতিক করনীতি, ট্রান্সফার প্রাইসিং, কর ফাঁকি অনুসন্ধান, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, ব্যবসা-বাণিজ্যের বাস্তবতা এবং করদাতা-রাষ্ট্র সম্পর্ক– সব মিলিয়ে এনবিআর রাষ্ট্রের সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
এখানে সাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন কর আইন, রাজস্বনীতি, ব্যবসায়িক বাস্তবতা এবং মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। করদাতার মনস্তত্ত্ব না বুঝে, ব্যবসার বাস্তবতা না জেনে, কর আইনের জটিলতা ও মাঠপর্যায়ের সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী আহসান হাবিবের বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি বিসিএস কর ক্যাডার থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন। এর আগে সবসময় এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রশাসন ক্যাডার থেকে।
এনবিআরের নেতৃত্বে একজন কর প্রশাসকের আগমন কেবল একটি গতানুগতিক প্রশাসনিক পদায়ন নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা। বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার নীতির এটি একটি দৃশ্যমান ও ইতিবাচক সূচনা। একটি নিয়োগেই পুরো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো বদলে যায় না; কিন্তু পরিবর্তনের সূচনা একটি সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েই হতে পারে।
চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালে ভারতের জনসংখ্যা চীনের চেয়ে প্রায় আট কোটি বেশি; অথচ চীনের অর্থনীতি ভারতের পাঁচ গুণেরও বেশি এবং মাথাপিছু জিডিপিতেও একই ধরনের বিশাল ব্যবধান। ১৯৮০ সালে যে ভারত বাস্তব উৎপাদনক্ষমতায় চীনের চেয়ে এগিয়ে ছিল, সেই ভারত আজ বহু পেছনে।
এই ব্যবধানের ভেতরে রয়েছে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও বিশ্ববাজারের গল্প; কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে নেতৃত্বের গুণগত পার্থক্যের গল্পও– একদিকে পেশাগত দক্ষতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করা, অন্যদিকে দীর্ঘদিন জেনারেলিস্ট আধিপত্যের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হতে না পারা।
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী: আয়কর আইনজীবী ও কোম্পানি আইন উপদেষ্টা
- বিষয় :
- অর্থনীতি