ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

ভিসি/প্রোভিসি/ট্রেজারার নিয়োগে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেরাই বঞ্চিত!

ভিসি/প্রোভিসি/ট্রেজারার নিয়োগে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেরাই বঞ্চিত!
×

অধ্যাপক ড. মো. আবু তালেব

মো. আবু তালেব 

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:১৮ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:২৭

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ তার শিক্ষক। শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস গড়েন। ঐতিহ্য তৈরি করেন। গবেষণা করেন। শিক্ষার্থী তৈরি করেন। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। সেই শিক্ষকই যদি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুযোগ থেকে বারবার বঞ্চিত হন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই– নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেরাই কেন বঞ্চিত?
এটি শুধু একটি নিয়োগের প্রশ্ন নয়। এটি উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। স্বাধীনতার পর হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও গত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। অসংখ্য শিক্ষক দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। গবেষণায় অবদান রাখছেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন। তাহলে প্রশ্ন হলো, যোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও কেন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়?
অবশ্যই কিছু ব্যতিক্রম আছে। নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক নাও থাকতে পারেন। বিশেষায়িত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাইরের একজন অভিজ্ঞ শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া যুক্তিযুক্ত। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়েও যদি একই প্রবণতা চলতে থাকে, তাহলে সেটি আর ব্যতিক্রম থাকে না; সেটি একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বছরের পর বছর সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেন। বিভাগ গড়ে তোলেন। নতুন কোর্স চালু করেন। গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষার্থীদের পাশে থাকেন। সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, ডিন, বিভাগীয় প্রধান, প্রক্টর বা ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নেতৃত্বের জন্য এসব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ভিসি, প্রোভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগের সময় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পাশ কাটিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এতে কি বার্তা যায়? বার্তা যায়, নিজের প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা নেই। নিজের শিক্ষকদের প্রতি বিশ্বাস নেই। নিজেদের মেধার মূল্য নেই। এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সুখকর বার্তা হতে পারে না।
একজন শিক্ষক যদি ৩০ বা ৩৫ বছর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন, তারপরও যদি তিনি নেতৃত্বের সুযোগ না পান, তাহলে তাঁর হতাশ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, তরুণ শিক্ষকরা তখন মনে করেন– গবেষণা, সততা ও কর্মদক্ষতার চেয়ে অন্য বিষয়ই হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি ভয়ংকর সংকেত।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিভিন্ন নীতিপত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যোগ্যতাভিত্তিক নেতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে অনেক শিক্ষাবিদ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন– উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগে একটি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও নীতিনির্ভর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অনেকটাই নির্ভর করে তাদের নেতৃত্বের ওপর।
বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ ধরনের নিয়োগে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। প্রার্থীর গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মূল্যায়ন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য অধ্যাপকরাই অগ্রাধিকার পান। কারণ তারা প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা সবচেয়ে ভালো বোঝেন। বাংলাদেশেও কি এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না?
একটি বিষয় হলো, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় যেন ভিসি, প্রোভিসি ও ট্রেজারার উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই বারবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্বাভাবিকভাবেই মনে করেন, তাদের যোগ্যতা মূল্যায়িত হচ্ছে না। এতে এক ধরনের একচেটিয়া সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি ও প্রয়োজন বুঝে পরিচালিত হওয়া উচিত। বাইরের কেউ যোগ্য হতে পারেন। কিন্তু তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, সমস্যা, সম্ভাবনা এবং অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বুঝতে সময় নেন, কখনও কখনও পুরো মেয়াদই পার হয়ে যায় দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতার মধ্যে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একজন যোগ্য শিক্ষক প্রথম দিন থেকেই বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত থাকেন। বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠানের জন্য শ্রম দেওয়া শিক্ষকদের উপেক্ষা করা হলে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে এ আলোচনার অর্থ এই নয় যে, বাইরের কেউ কখনও উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার হতে পারবেন না। অবশ্যই পারবেন। কিন্তু সেটি হবে ব্যতিক্রম। নিয়ম নয়। প্রথমে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং সৎ নেতৃত্ব আছে কিনা। থাকলে তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
আজ দেশের উচ্চশিক্ষা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে। গবেষণা প্রকাশনা, পেটেন্ট, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায়ও আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। এ বাস্তবতায় নেতৃত্ব নির্বাচন হতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়। এখানে কোনো ধরনের পক্ষপাত বা অনাস্থার সুযোগ নেই।

এখন সময় এসেছে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের। যেখানে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগের যোগ্যতা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। গবেষণার মান, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, একাডেমিক নেতৃত্ব, সততা এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং মেধাভিত্তিক।
বিশ্ববিদ্যালয় একটি জাতির বিবেক গড়ে তোলে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। নিজের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করে কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক পরীক্ষাগার নয়; এটি জাতির বিবেক গঠনের প্রতিষ্ঠান। সেখানে নেতৃত্ব বাছাইয়ে যদি নিজস্ব মেধার মূল্যায়ন না হয়, তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যায়। তাই সময়ের দাবি একটাই– যোগ্যতা থাকলে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব আগে নিজের শিক্ষকদেরই দিতে হবে। এতে শুধু একজন শিক্ষক ন্যায্য সম্মান পাবেন না; শক্তিশালী হবে প্রতিষ্ঠান, সমৃদ্ধ হবে উচ্চশিক্ষা, লাভবান হবে বাংলাদেশ।

ড. মো. আবু তালেব: অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
 

আরও পড়ুন

×