ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

নিরাপত্তা ত্রুটিতে মামলার এক মাস পরই ফেরদৌস স্টিলে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ মৃত্যু

নিরাপত্তা ত্রুটিতে মামলার এক মাস পরই ফেরদৌস স্টিলে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ মৃত্যু
×

ফেরদৌস স্টিলের শিপইয়ার্ডে এই জাহাজটি ভাঙার কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। ছবি: সমকাল

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ২০:০০

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, দুর্ঘটনার মাত্র এক মাস আগে পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

ডিআইএফই সূত্রে জানা গেছে, নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি পাওয়ার পর গত ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে কয়েক দফা তাগাদা দেওয়া হলেও নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

এর এক মাসের মাথায় শুক্রবার সকালে ফেরদৌস স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে নোঙর করা একটি পুরোনো এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজে স্ক্র্যাপ কাটার সময় গ্যাস ছড়িয়ে নয়জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ ও গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ডিআইএফইয়ের তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটির ভেতরে স্ক্র্যাপ কাটার কাজ চলছিল। এ সময় হঠাৎ গ্যাস লিকেজ হয়ে কার্বন মনোক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। এতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে শ্রমিকেরা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন এবং অনেকে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে একে একে নয়জনের মৃত্যু হয়।

আগেই দেওয়া হয়েছিল নোটিশ
চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে কর্মকর্তারা কিছু ব্যত্যয় দেখতে পান। এরপর গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে নোটিশ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, কয়েক দফা তাগাদা দেওয়ার পরও কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি। এ কারণে গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

ডিআইএফইয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, দুর্ঘটনার পর সংস্থার একটি প্রতিনিধি দল কারখানা পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় উত্তেজিত লোকজন তাদের ওপর হামলা করেন। এতে দুই শ্রম পরিদর্শক গুরুতর আহত হন।

জাহাজটির অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর ওই জাহাজটি কাটার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, ফেরদৌস স্টিলের কোন জাহাজের অনুমোদন আছে আর কোনটির নেই, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকা ঘিরে রাখায় তাদের পরিদর্শকেরা ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। তদন্তের পর বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

তিনি বলেন, শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতিই যথেষ্ট নয়। জাহাজ কাটার ক্ষেত্রে বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ আরও কয়েকটি সংস্থার অনুমতির প্রয়োজন হয়।

নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন
জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে কাজের আগে জাহাজের ট্যাংক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরীক্ষা করে সেখানে দাহ্য বা বিষাক্ত গ্যাস নেই- এমন নিশ্চয়তা পাওয়ার কথা। পাশাপাশি জাহাজে থাকা তেল, জ্বালানি, স্লাজ, বিলজ ওয়াটারসহ বিভিন্ন দূষণকারী ও বিপজ্জনক পদার্থ অপসারণের নিয়ম রয়েছে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে এবার নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার মাত্র এক মাস আগে একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে মামলা হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।

এ ঘটনায় কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা, জাহাজটির অনুমোদন এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×