ঢাকা শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিশুকাল থেকে শুরু করে ১২০ সিনেমা, যন্ত্রণায় ভরা ছিল অভিনেত্রীর জীবন

শিশুকাল থেকে শুরু করে ১২০ সিনেমা, যন্ত্রণায় ভরা ছিল অভিনেত্রীর জীবন
×

সালমা বেগ (নাজ)

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:৫৭ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:০৬

মাত্র ১০ বছর বয়সেই খ্যাতি পেয়েছিলেন, যা অনেক অভিনেতার কাছেও স্বপ্নের মতো। রাজ কাপুরের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, নিজের সময়ের অন্যতম পারিশ্রমিক পাওয়া শিশুশিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৫৫ সালে ‘বুট পলিশ’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবে পেয়েছিলেন ‘স্পেশাল মেনশন’। কিন্তু সাফল্যের আড়ালে তাঁর শৈশব ছিল ক্ষুধা, পারিবারিক অশান্তি, শোষণ ও মানসিক যন্ত্রণায় ভরা। বলছি, ভারতীয় শিল্পী নাজের কথা।

সালমা বেগ নামে জন্ম নেওয়া নাজ মাত্র চার বছর বয়সে মঞ্চে নাচ শুরু করেন। প্রথমে শখের বশে নাচলেও ধীরে ধীরে সেটি হয়ে ওঠে পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। তার বাবা ছিলেন গল্প লেখক। কিন্তু পরিবারের খরচ চালানোর মতো পর্যাপ্ত আয় করতে পারতেন না। ফলে প্রতিটি অনুষ্ঠানে প্রায় ১০০ রুপি করে পারিশ্রমিক পেতে শুরু করেন নাজ।

আট বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আসে তার। শুরুতে বাবা-মা কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও অর্থের প্রয়োজন তাদের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। এরপর নিয়মিত সিনেমায় অভিনয় করতে থাকেন নাজ। ফলে পড়াশোনার সুযোগ ক্রমেই কমতে থাকে।

রাজ কাপুরের ‘বুট পলিশ’ তার জীবন বদলে দেয়। সিনেমাটি তাকে রাতারাতি পরিচিত করে তোলে। এমনকি  স্কুল কর্তৃপক্ষও তাকে আবার পড়াশোনা শেষ করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু তত দিনে পরিবারের কাছে নাজ হয়ে উঠেছেন গুরুত্বপূর্ণ উপার্জনকারী।

এক পুরোনো সাক্ষাৎকারে নাজ জানিয়েছিলেন, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পেছনে তার মায়ের বড় ভূমিকা ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মা তার হয়ে একের পর এক সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করতেন। অন্যদিকে বাবা কাজ করাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। পরিবারের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নাজকে কাজ করে যেতে হতো। অথচ এত টাকা উপার্জন করেও নিজের জীবনে তার সুফল খুব একটা পাননি তিনি। বাড়িতে বাবা-মায়ের নিয়মিত ঝগড়া চলত। অনেক সময় শুটিং শেষে বাড়ি ফিরে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তেন। নাজের দাবি ছিল, এমন ঘটনা অসংখ্যবার ঘটেছে।

বাবার অসুস্থতার কারণে তার পরিস্থিতির জন্য তাকে খুব একটা দায়ী করেননি নাজ। বরং মায়ের অর্থের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহকেই দায়ী করেছিলেন। তার ভাষ্য, অর্থ উপার্জনের বিষয়টি তার মায়ের কাছে ধীরে ধীরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এই পরিস্থিতিতে মাত্র ১০ বছর বয়সে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। পরে আরও একবার একই চেষ্টা করেছিলেন; সেবারও আয়া তাকে রক্ষা করেন। নাজের দাবি, আত্মহত্যার চেষ্টার পর মায়ের কাছ থেকে সহানুভূতির বদলে মারধর ও বকাঝকা পেয়েছিলেন।

‘বুট পলিশ’-এর সাফল্যের পর নাজের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন রাজ কাপুর। সিনেমাটির প্রযোজক রাজ কাপুর তাকে পড়াশোনার জন্য সুইজারল্যান্ডে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি দেশে ফিরে এলে তাকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু নাজের মা সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। কারণ, মেয়েকে কয়েক বছরের জন্য বিদেশে পাঠালে পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যেত।

পরবর্তী সময়ে নাজ জানতে পারেন, তার বাবা-মায়ের দাম্পত্য সমস্যার পেছনে আরও একটি বিষয় ছিল। তার দাবি অনুযায়ী, তার মা ক্যামেরাম্যান রাজেন্দ্র মালোনির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ চেয়েছিলেন। একপর্যায়ে তার বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। প্রায় দুই বছর বাবার অবস্থান সম্পর্কেও জানতেন না নাজ।

প্রায় ১২০টি সিনেমায় অভিনয় করেও নিজের নামে কোনো আর্থিক নিরাপত্তা ছিল না বলে দাবি করেছিলেন নাজ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি, সম্পত্তি, গয়না ও নগদ অর্থ—সবই ছিল তার মায়ের নামে।

১৬ বছর বয়সে এসে অবশেষে মায়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন নাজ। মা রাজেন্দ্র মালোনিকে বিয়ে করার পর তাঁর সঙ্গে থাকতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। পরে বাবাকে খুঁজে বের করে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন। এমনকি মাকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে দেন।

১৯৬০ সালে অভিনেতা সুবীরাজের সঙ্গে নাজের পরিচয় হয়। পাঁচ বছর সম্পর্কের পর ১৯৬৫ সালে তারা বিয়ে করেন। সুবীরাজ ছিলেন কাপুর পরিবারের সদস্য; তার মা ছিলেন পৃথ্বীরাজ কাপুরের বোন।

নাজ জানিয়েছিলেন, সুবীরাজই তার জীবনে প্রথম ব্যক্তি, যিনি তাকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন এবং ভালোবাসা ও মানসিক সমর্থন দিয়েছিলেন। বিয়ের পরও অভিনয় চালিয়ে যান নাজ। ‘কাটি পতং’ ও ‘সচ্চা ঝুঠা’র মতো সিনেমায় ছোট চরিত্রে দেখা যায় তাকে। কিন্তু শিশুশিল্পী হিসেবে পাওয়া সেই খ্যাতি আর ফিরে আসেনি।

প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেত্রী হিসেবে প্রধান চরিত্র পাওয়ার চেষ্টায়ও নানা সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তার অভিযোগ ছিল, চলচ্চিত্রে কাজ পাওয়ার জন্য অনেক অভিনেত্রীকে আপস করতে হতো। তিনি নিজে এমন প্রস্তাবে রাজি হননি।

পরবর্তী সময়ে ডাবিংয়ের কাজ করেন নাজ। হিন্দি সিনেমায় শ্রীদেবীর কণ্ঠ দেওয়ার কাজও করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি সংগীতভিত্তিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেও আয় করতেন। তবু বড় তারকা হওয়ার স্বপ্ন তার মধ্যে বেঁচে ছিল।

কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন আর ঘটেনি। ১৯৯৫ সালে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ক্যানসারে মারা যান নাজ। সূত্র: এনডিটিভি

আরও পড়ুন

×