ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা দরকার

সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা দরকার
×

আরিফুর রহমান অপু, চেয়ারম্যান, বিএসএফআইসি

জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২২ | ২৩:০৬

সমকাল :চিনিকলগুলোকে কীভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব?
আরিফুর রহমান অপু :বর্তমানে ৯টি সরকারি চিনিকল চালু রয়েছে। যেগুলোর আখ মাড়াই ক্ষমতা ১২ হাজার ১৬৬ টন। চিনিশিল্পের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এখনও আছে। সেই চিন্তা থেকে পাঁচ বছরের জন্য একটা পথনকশা তৈরি করা হয়েছে। পথনকশা অনুযায়ী, আখ উৎপাদন বাড়ানো হবে। অনাবাদি জমিগুলোতে আখ চাষ করা হবে। সেজন্য দরকার কৃষককে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়া। কিছু আধুনিক নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে। এসব কাজের অগ্রগতির জন্য অর্থের প্রয়োজন। বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার সহজ শর্তে আগামী পাঁচ বছর আর্থিক সহায়তা দিলে এ শিল্পের মুনাফায় ফেরার খুবই সম্ভাবনা রয়েছে। সেজন্য প্রথম বছর দরকার হবে ৩০০ কোটি টাকা। তবে প্রতি বছর এই আর্থিক সহায়তা নেওয়ার পরিমাণ কমে আসবে। পঞ্চম বছরে দরকার হবে ১০০ কোটি টাকার। এরপর আর আর্থিক সহায়তার দরকার হবে না। উৎপাদনযজ্ঞ পুরোদমে চালু থাকলে সব খরচ বহন করেই মুনাফা করা শুরু করবে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)।

সমকাল :দেশে উৎপাদিত চিনির মান ও দাম কেমন?
আরিফুর রহমান অপু :বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের উৎপাদিত চিনির মান অত্যন্ত উৎকৃষ্ট ও পুষ্টিকর। এই চিনি পুরোপুরি নির্ভেজাল ও শিশু খাদ্যোপযোগী। আখের চিনিগুলোর মান এত ভালো যে, বাজারে যদি ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়, তবুও মানুষ এই চিনি খাবে। অথচ বাজারে আমদানি করা চিনি প্রতি কেজি ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও আমাদের উৎপাদিত চিনি বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭৫ টাকায়। উৎপাদনের চেয়ে চিনির বিক্রয়মূল্য অনেক কম। ফলে প্রতি কেজি চিনিতে সুদসহ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫০ থেকে ২০০ টাকাও লোকসান দিতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সমন্বয় করা খুবই প্রয়োজন।

সমকাল :চিনির উৎপাদন কমতে কমতে এখন তলানিতে এসে ঠেকছে। উৎপাদন বাড়াতে কী উদ্যোগ নেওয়া দরকার?
আরিফুর রহমান অপু :লাভ কম হওয়ায় কৃষকরা আখ চাষে বিমুখ হচ্ছেন। তাছাড়া উচ্চ ফলনশীল জাতের অভাবেও আখ উৎপাদন কমেছে। এক সময় প্রতি একর জমিতে ৫০ থেকে ৬০ টন উৎপাদন হলেও তা এখন নেমে এসেছে ১০ থেকে ১৫ টন। অর্থ সংকটে করপোরেশনও চাষিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারছে না। তবে এখন বিএসআরআই-৪৮ জাতের উন্নত বীজ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে কৃষককে। এতে ফলন অনেক বেশি হবে। মিলগুলো অনেক পুরোনো হওয়ায় সেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে গেছে। সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বাড়ছে। নতুন কিছু মিল স্থাপন করা হলে চিনির উৎপাদন বাড়বে।

সমকাল :বছরের বেশিরভাগ সময় চিনিকলগুলো অলস পড়ে থাকে। এর কারণ কী?
আরিফুর রহমান অপু :মিলগুলো চালু রাখতে যে পরিমাণ আখ দরকার তা পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো মৌসুমে ১২০ থেকে ১৪০ দিন চালাতে পারলে চিনির উৎপাদন অনেক বাড়ানো যেত। কিন্তু কোনো কোনো মিল ২২ থেকে ২৫ দিনের বেশি চালানো যায় না। আখের উৎপাদন বাড়িয়ে কীভাবে পুরো মৌসুম মিল চালু রাখা যায় এখন সে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

সমকাল :কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ছাড়া দেশের অন্য ১৪টি সরকারি চিনিকলের লোকসানে রয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে লাভজনক করা যায়?
আরিফুর রহমান অপু :ঠাকুরগাঁও, নর্থবেঙ্গল ও মোবারকগঞ্জ চিনিকলের অধীনে অনেক জায়গা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে কীভাবে নানামুখী পণ্য উৎপাদন করা যায় সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। এর মধ্যে নর্থবেঙ্গল ও ঠাকুরগাঁওয়ে এই দুটি চিনিকলে চিনির পাশাপাশি বৈচিত্র্যপণ্য হিসেবে এক্সট্রা নিউট্রল ও অ্যালকোহল উৎপাদন করা যেতে পারে। এসব পণ্য রপ্তানি করা যাবে। এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে জৈব সার, হার্ডবোর্ড কাগজ ও প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা যেতে পারে। সঠিক কর্মপরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় নীতি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে অল্প সময়ে কেরুর মতো এসব প্রতিষ্ঠানও লাভজনক করা সম্ভব।

সমকাল :এ শিল্পের উন্নয়নে সরকারের কী ধরনের সহায়তা দরকার?
আরিফুর রহমান অপু :লোকসান দিয়ে চিনি বিক্রি ও ভর্তুকি বাবদ সরকারের কাছে ছয় হাজার ৩৪২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে করপোরেশনের। এই অর্থ ছাড় করা খুব জরুরি। আখ কেনায় সরকার ২৫ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার কথা। এখন দেওয়া হচ্ছে না। এই টাকা দিলে চিনি করপোরেশন ঘুরে দাঁড়াতে পারত। আখ কেনায় ভর্তুকি বাবদ ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরের ২০০ কোটি টাকা আটকে আছে। অর্থ বিভাগ থেকে এই টাকা ছাড় করা দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের ব্যাংক ঋণ। এই ঋণের বিপরীতে সুদের বোঝা টানতে হচ্ছে। সুদ মওকুফ করা প্রয়োজন। কারণ বছরের পর বছর ঋণের সুদ টানতে টানতেই নুইয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারের আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলে চিনি উৎপাদন বাড়িয়ে বেসরকারি আমদানিকারকদের সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব। তখন চিনির বাজারে অস্থিতিশীলতা হবে না। দেশে উৎপাদন বাড়ালে অনেক বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

আরও পড়ুন

×